top of page

'কাছের মানুষ' - যেখানে জীবন জিতে যায়


দিন দিন বড্ড একা হয়ে যাচ্ছ তুমি। মুখটা শুকনো লাগছে খুব। অবশ্য অনেক দিন সামনে থেকে দেখা হয়নি। চোখে চোখ পড়েনি আজ বহুকাল হয়ে গেল। জীবনের অনেক গুলো গল্প ফাঁকা বারান্দাই রচনা করে দেয়। তার জন্য আলাদা করে কোনো চেষ্টা লাগে না। একটা সময় বারান্দায় বসে কেটে গেছে অনেকটা সময় । এখন আর সেখানে যাওয়া হয় না খুব একটা। সময়ের অভাব ঠিক নয়, ইচ্ছে করে না। আসলে বারান্দা থেকে যাদের দেখতে পাওয়া যেত তারা এখন অনেক দূরে থাকে। ঘর -সংসার আর নিজের মানুষদের নিয়ে তাদের এখন অন্য পৃথিবী। সে পৃথিবীতে কাজহীন মানুষহীন সত্যিকারের বন্ধুহীন ছন্নছাড়া মানুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। হাতে সময় পেলে দু-দন্ড পাশে এসে বসো দুটো কথা বলো। একরাশ মন খারাপের মুহূর্তে যদি আমার আলো না হলে, চোখ বন্ধ করে যদি আমায় অনুভবই না করলে তবে তুমি 'কাছের মানুষ' হলে কি করে বলো তো? 'কাছের মানুষ' সবাই হতে পারে না। পাশের আর কাছের হওয়ার মধ্যে অনেকটা ফাঁক। দূরত্বের সব একক দিয়েও তার পরিমাপ করা সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে জমতে থাকে হৃদাকাশের কালো মেঘ যে মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়না আবার মেঘ কেটে রোদও ওঠে না। চারপাশে একটা থমথমে ভাব সব কিছু যেন বেসামাল করে দেয়। জীবনের মোড় মাথায় দাঁড়িয়ে গাড়ি ব্যাক গিয়ার দেয়। পিছতে পিছতে যখন প্রায় একটা অন্ধকার খাদের কিনারে শ্বাস ফেলছে জীবন ঠিক তখনই কেউ হাতটা ধরে নেয়। আবার সবটা শুরু হয় প্রথম থেকে।


সেই জীবনের গল্পই বলেছে 'কাছের মানুষ'। একটা রেল লাইনের দুধারে দাঁড়িয়ে আছে দুটো মানুষ। যাদের উৎস আলাদা হলেও গন্তব্যের প্রবৃত্তি একই দিকে। কিন্তু সময় তো সব সময় জীবন থেকে মুক্তি দেয় না কখনও কখনও জীবনের মায়াজালে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে যেখানে দাঁড়িয়ে বাঁচতে চাওয়ার আকুতি আরো জোরালো হয় বাঁচিয়ে রাখার জেদ আরো তীব্র হয়ে ওঠে। ফিরে আসে কুন্তল আর সুদর্শন। অনেকটা দূর গিয়ে যেমন মিশে যায় রেল লাইন তেমনি কোথাও গিয়ে ওদের জীবনটাও মিলে যায়, নিজের অজান্তেই ওরা খুঁজে পায় কাছের মানুষকে। তবে সবকিছু খুঁজে পেলেই বুঝে ফেলার সাধ্য আমাদের নেই। সময় লাগে বুঝে নিতে সময় লাগে বুঝিয়ে দিতে।


গল্পের অন্যতম মুখ্য চরিত্র কুন্তল আগেই হারিয়েছে বাবাকে। একে একে ভাই এর আত্মহত্যা বাবা ও ভাই এর মৃত্যু মেনে নিতে না পারায় প্যারালাইস্ড হয়েছেন মা ও। সংসারের চরম অভাব, বেকারত্ব, মায়ের চিকিত্সার টাকা জোগাড় করতে না পারা এই সমস্ত কারণ একত্রিত হয়ে এক মৃত্যুর প্রতিচ্ছবি ঘনীভূত হচ্ছে কুন্তলের জীবনে। অন্যদিকে এক অসহায় দাদা সুদর্শন বুঝতে পারে না বোনকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখবে। কোথাও গিয়ে ওদের দুঃখ গুলো মিলে যায়। গল্প শুরু হয় মৃত্যুর এই ভয়াবন প্রেক্ষাপটে। আলো চরিত্রে একজন প্রাণবন্ত মেয়ে হিসেবে ঈশার অভিনয়ে সে রকম কোনো ত্রুটি ছিল না। মধুরা পালিতের চোখ দিয়ে দর্শক দেখেছেন এক অন্য আলোকচিত্র। উত্তর কলকাতার প্রতিটা গলি থেকে কলেজস্ট্রিটের রাস্তা, টানা রিক্সা সবটাই ধরা দিয়েছে তাঁর ক্যামেরায়। নর্থ ক্যালকাটার রাস্তার ধারের ফুচকা, এগরোল, কাটলেট একটা আলাদা ফ্লেবার যোগ করেছে ছবির বিভিন্ন পরতে। কিছু দৃশ্যে দেব এর অভিনয় আরো ভালো হতে পারত জড়তা কাটিয়ে আর একটু সাবলীল হলে ভালো লাগত। প্রসেনজিত্ চ্যাটার্জি নেগেটিভ এবং পজেটিভ দুই রোলেই নিজের সাধ্য মতো চেষ্টা করেছেন বিশেষ করে কমিক রিলিফ এর ক্ষেত্রে। তবে কিছু জায়গায় অপ্রয়োজনীয় কমিক সীন এর ব্যবহার ছবির মূল বিষয়কে কিছুটা আলগা করে দিয়েছে। আশা চরিত্রটি ছোটো হলেও ছবিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ তাত্পর্য বহন করেছে। তবে ছবির কিছু কিছু দৃশ্য অকারণে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিষয়বস্তুর সঙ্গে সমান তালে চলেছে স্ক্রীন-প্লে। কিছু দৃশ্যের কথোপকথন ভীষণ ভাবে দর্শকের মনে প্রভাব ফেলতে পেরেছে। ছবির দ্বিতীয়ার্ধে বারবার কুন্তলকে মারার চেষ্টা ছবির দৃশ্যায়নে কিছুটা একঘেয়েমি এনেছে। প্রসেনজিত্ এবং দেব এর মধ্যে বোঝাপড়া ভালো ছিল। পথিকৃত বসুকে আমরা অন্যধারার ছবিতেই দেখেছি তবে নতুন রকম প্রচেষ্টা পুরোটা না হলেও বেশ অনেকটাই সফল। আর এই ছবির একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্লাসপয়েন্ট হল ছবির গান। নীলায়নের তৈরি 'মুক্তি দাও' গানটির মাধ্যমে ছবি মুক্তির আগে থেকেই ছবি সম্পর্কে দর্শকের ধারণা অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছিল। যা পরবর্তীতে হলে দর্শক আনতে অনেকটাই সাহায্য করেছে। তরকারিতে গরম মশলার মতো ভূমিকায় ছিলেন অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক। গল্পের শেষ সিনে এন্ট্রি নিয়ে তিনি বরাবরের মতো গল্পকে আলাদা স্বাদ যোগ করে দিয়েছেন। সব মিলিয়ে বক্স অফিসে বিরাট বড়ো ঝড় তুলতে না পারলেও আর পাঁচটা গড়পড়তা বাংলা ছবির তুলনায় গল্পের ভাবনায় ও অভিনয়ে 'কাছের মানুষ ' অনেকটাই এগিয়ে। জীবন মৃত্যুর দোলাচলে দাঁড়িয়ে মানুষকে লড়াই করে বেঁচে থাকার গান শোনাবে কাছের মানুষ। যে গান অনেক হেরে যাওয়া মানুষের জীবনে সুর ফিরিয়ে এনে তাকে নতুন করে বাঁচতে শেখাবে।


Comments


bottom of page