top of page

Himachal Diary

হিমাচল ডাইরি-

Date: 30th April, 2017:

সকাল ৭ টা - আজ সকালটা অন্য র ৫টা দিনের থেকে অনেকটাই আলাদা। প্রায় ১ বছর ধরে দেখা স্বপ্ন গুলো সত্যি হতে চলেছে। বাগ পাকিং প্রায় সমাপ্ত। শুধু একবার প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো দেখে নেওয়া। সন্ধ্যা ৭ টা ৪০ মিনিট এ ট্রেন হাওড়া থেকে। আমরা ১১ জন আর আমাদের এবারের গন্তব্য হিমাচল প্রদেশ। অনেক শুনেছি জায়গাটা সম্বন্ধে। ইউটিউব এ ভিডিও দেখে প্রেমেও পরে গেছি এই হিমালয় এর রানির উপর। এখন শুধু ছুয়ে দেখা বাকি। মনে মনে প্রস্তুতি টা শুরু করেছিলাম প্রায় ১ বছর আগে।

দুপুর ২টা – একটা টাটা ওয়িঞ্জার গাড়ি করে যাত্রা শুরু হল হাওড়া স্টেশান এর দিকে। বারি থেকে হাওড়া যেতে সময় লাগবে প্রায় ২ ঘণ্টা। একটু তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে পড়লাম। এতটা রাস্তার ব্যাপার। গ্রীষ্মের ভ্যাপসা গরম এ ব্যাগ এ এক গাদা শীতের পোশাক। মনে মনে হাসি পেল।

দুপুর ৪ টা – প্রত্যশা মতো সঠিক সময়ে হাওড়া এসে গেলাম। হাথে অনেক সময়।স্টেশান এর ৯ নম্বর প্লাটফর্ম সবাই মিলে আড্ডা দিতে বসলাম। এই সময় ১১ জন এর একটু পরিচয় দিয়ে রাখি আমার সাথে। আমি (সৌরভ), মা, বাবা, আমার স্ত্রী (ভাগ্যশ্রী), দাদা, বৌদি, ভাইঝি (প্রেরনা), মাসি, জ্যাঠাইমা, জ্যেঠু আর আমার ভাই/বন্ধু অনিরুদ্ধ।

সন্ধ্যা ৭ টা – হাওড়া দিল্লী কালকা মেল সঠিক সময় এ প্লাটফর্ম এ প্রবেশ করল। ৩য় এসি টে বি ২ টে আমাদের টিকিট। আমরা যথা সময় এ আমাদের স্থান নিলাম র ঠিক সময় এ ট্রেন হাওড়া ছেরে এগিয়ে চলল আমাদের প্রথম গন্তব্য কালকার দিকে।

Date: 1st May, 2017:

সকাল ৭ টা - আজ সারাদিন ট্রেন চড়া। ট্রেন একদম সঠিক সময় এ চলছে। আড্ডা, গান, গল্প র মজা সব কিছুই চলছে। উত্তর প্রদেশ এর মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছি। এ সি র বাইরে থাকাই যাচ্ছে না। যেন লু বইছে। এই ট্রেন টার ইতিহাস ও কিছু কম নয়। ব্রিটিশ রাজ এর সময় এ যখন ভারতে প্রথম ট্রেন চালু হয়, তখন প্রথম ট্রেন ছিল ১ আপ এবং ২ ডাউন ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে মেল যা হাওড়া থেকে দিল্লী র মধ্যে চলাচল করত। এরপর গ্রীষ্ম এর প্রচণ্ড দাবদহ থেকে বাচতে ব্রিটিশ রা তাদের গ্রীষ্মকালীন প্রধান কার্যালয় কলকাতা থেকে সিমলা থানান্তারিত করার সিধান্ত নেয় আর তখন এই ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে মেল কে কালকা পর্যন্ত বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আর সেই থেকেই শুরু হয় আজকের এই কালকা মেল এর যাত্রা।

রাত ১০ টা – আমরা এখন ওল্ড দিল্লী। কাল সকাল এ আমরা কালকা গিয়ে পোঁছাব।

Date: 2nd May, 2017:

সকাল ৭ টা – এই মাত্র কালকা স্টেশান এ নেমেছি। একদিকে দারিয়ে আছে শিবালিক দিলাক্স আর অন্যদিকে কালকা সিমলা মেল।আমাদের সিট বুকিং কালকা সিমলা টে। টয় ট্রেন এ বসে ব্রেড, ডবল এগ মামলেট, টোম্যাটো সস আর এক কাপ করে চা খেয়ে নিলাম। ৫ ঘণ্টা র যাত্রা পথ। একটু পেটে দানাপানি দিয়ে নিলাম।

সকাল ৭ টা ৩০ মিনিট- ২ ফুট ৬ ইঞ্চি আঁকা বাঁকা লাইন ধরে আমাদের রোমাঞ্চকর যাত্রা শুরু হল। ২০০৮ সালে UNESCO এই ট্রেন কে Heritage Railway of Mountain Railway of India রুপে আখ্যায়িত করেছে। এই যাত্রা পথে ১০৩ টি টানেল আর ৯৮৮ টি ব্রিজ আছে। আসাধারন এই যাত্রাপথ নিমেশে সব ক্লান্তি দূর করে দিল। কালকের সেই ভ্যাপসা গরম আর নেই। হিমেল হাওয়া যেন ধাক্কা দিতে শুরু করল মনের আন্তরালে। চলেছি হিমালয় এর রানি সিমলা তে। কতই না স্বপ্ন বোনা এই জায়গা নিয়ে। একটা ভাললাগা অনুভূতি বার বার এসে মনকে উদাস করে দিচ্ছিল। পাইন, ওক, দেওদার গাছের ঢাল বেয়ে সাপের মতো এঁকে বেঁকে এগিয়ে চলেছে আমাদের রথ। আর মাঝে মাঝে সুরঙ্গের অন্ধকার আলাদা এক এডভেঞ্চার এর গন্ধ জাগাচ্ছিল এই পরিবেশে। মানুষ প্রকিতির বুকে এঁকে দিয়েছে সভ্যতার চিহ্ন।

সকাল ৯টা – আমরা এখন বারগ স্টেশান এ আর আমরা পেরিয়ে এলাম এই রেল পথের সবথেকে দীর্ঘতম টানেল। এই টানেল নিয়ে একটা রোমাঞ্চকর গল্প আছে। ব্রিটিশ ইঞ্ছিনিয়ার কর্নেল বারগ যখন এই টানেল এর খননকার্য শুরু করেন, তাঁর সামান্য হিসাব গোলযোগের করনে তিনি টানেল টির দুদিকের সংযোগ ঘটাতে পারেন্ নি। তখন ব্রিটিশ সারকার তাকে মাত্র ১ টাকা ফাইন করে এবং সেই বার্থটা মানতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করেন। এর পর কর্নেল হারলিংটন সেই অপূর্ণ কাজ হাথে নেন। কিন্তু তিনিও বার্থ হন। পরে এক সাধুর চেষ্টায় আগের স্থান থেকে ১ কিমি. দূরে আজকের ১১৪৬মিটার দীর্ঘ এই টানেল নির্মাণ করেন। তবে আজ ও আগের টানেল টি বন্ধ করা যায়নি। শোনা যায় সেই টানেল বন্ধ করতে গেলে টা আবার ভেঙ্গে যায়।

সকাল ১২টা ৩০ মিনিট- এই মাত্র সিমলা স্টেশান এ এলাম। অসাধারন ৯৬ কিমি রাস্তা একটা অমুল্য স্মিতি হয়ে থেকে যাবে। স্টেশান থেকে গুটি গুটি পায়ে বেড়িয়ে এলাম সিমলা র রাস্থায়......।

সকাল ১২টা ৩০ মিনিট- ট্রেন থেকেই ধীরে ধীরে পাহাড়ের রানীর ছবিটা চোখের সামনে পরিষ্কার হচ্ছিল। ট্রেন এর বাইরে দূরে পাহাড়ে জাখুর মূর্তি আর ম্যলে হাওয়ার সাথে উরে বেরান ভারতের পতাকা সিমলার রঙিন উপ্তস্থিতি জানান দিল। সিমলার বেরাতে আশার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল সিমলাতে থাকার জায়গা ঠিক করতে গিয়ে। ৬মাস আগে ই মেল করে বুক করে ফেলি সিমলার সবথেকে সুন্দর এবং সমস্ত বাঙ্গালীর প্রিয় সিমলা কালীবাড়ি গেস্ট হাউস। ১১ জনের জন্য ৪ টে রুম বুক করা। শুনেছি ষ্টেশন থেকে কুলি নিয়ে কালীবাড়ি পোঁছান সবথেকে বুব্ধিমানের কাজ, তাই দেরি না করে কুলির পিঠে বেশিরভাগ ব্যাগ চাপিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সিমলা কালিবাড়ির দিকে। ১৫ মিনিটে এসে গেলাম কালীবাড়ি। বুকিং এর কাগজ দেখিয়ে ৪ টে রুম এর চাবি নিলাম। কেয়ারটেকার গিয়ে রুম দেখিয়ে দিল। খুব খুব অল্প খরচে বাঙ্গালিরা থাকতে পারে কালীবাড়ি। তাই কেমন রুম হবে সে নিয়ে একটু চিন্তা ছিল বইকি। তবে এখানেই অবাক হওয়া বাকি ছিল। খুব ভাল মানের হটেল এর থেকে কিছু কম যায়না। ৪ টে রুম এ ১৪ টি বেড আছে আর আমরা ১১ জন। তিনদিক খোলা ঘর আর ঘরে বসে বসে আপনি অনায়াসেই অলস সময় কাটিয়ে দিতে পারবেন দূরে পাহাড়ে জাখু মূর্তি, ম্যল এর ক্রাইস্ট চার্চ আর উদ্দাম হাওয়ায় উড়ে বেরানো বিরাট ভারত এর পতাকার দিকে তাকিয়ে।

দুপুর ১টা- কালীবাড়ি তে যে লাঞ্চ এর ব্যবস্থা আছে তা ১.৩০ থেকে ২ তো পর্যন্ত খোলা থাকে তাই আগে আমরা মাছ ভাত তরকারি খুব কম দামে খেয়ে নিলাম। বাংলালি খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিতে গেলাম। সিমলা, ব্রিটিশ দের হাতে তৈরি শহর। রুম এ বসে বসেই ব্রিটিশ স্থাপত্যের ছোঁয়া দেখতে পাচ্ছিলাম রূপসী সিমলার চারিদিকে। সিমলা ম্যলের উপরে উড়ন্ত পতাকা তা যেন বার বার হাথ নাড়িয়ে ডাকতে থাকল। আর বসে থাকা গেল না।

বিকাল ৩টে ৩০মিনিট- এখন আমরা সিমলা ম্যলে। সবার রেডী হতে হতে ৩টে বেজে গিয়েছিল। কালীবাড়ি থেকে সোজা পথ গিয়েছে সিমলা পোস্ট অফিস পেরিয়ে ম্যাল এর দিকে। অসংখ্য মানুষের ঢল নেমেছে পথে। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। তবে আজ আবহাওয়াটা খুব রোদ ঝলমলে তা বলা যাবে না।প্রথমেই ম্যল এর মুখে স্কেন্ডল পয়েন্ট। শোনা যায় পাতিয়ালার মহারাজা ভুপেন্দর সিং ব্রিটিশ ভাইসরয় এর মেয়ের প্রেমে পরে এই স্থান থেকে তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।আর সেই ঘটনার পর থেকে চৌমাথা এ স্থান এর নাম হয় স্কেন্ডল পয়েন্ট।

বিকাল ৪টে- গেইতি কালচারাল কমপ্লেক্স এর একটি চিত্র প্রদর্শনী চলছে ঠিক গেইতি থিয়েটার এর পাশে। প্রবেশ আবাধ। তাই আমরাও অবাধে কিছু অপূর্ব চিত্রকলার নমুনা উপভোগ করে নিলাম।

বিকাল ৪টে ৩০মিনিট- গেইটি থিয়েটার এর সামনে এখন আমরা। ১০টাকা টিকিট কেটে ভিতরে যাওয়ার অনুমতি মিলল। সঙ্গে পেলাম এখানকার আর্ট অ্যান্ড কালচারাল কমিটির কর্মী শ্যমলাল বাবুকে। তাঁর কাছে থেকে জানতে পারলাম এই থিয়েটার এর অপূর্ব কাহিনি। এশিয়ার সবথেকে পুরনো থিয়েটার এর মধ্যে আমরা। শ্যমলাল বাবুর কাছেই জানতে পারলাম এখানকার বিশেষত্ব হল আওয়াজ। এখানকার গায়ের পেপার এর কাজ এম্ন ভাবেই করা আছে যে কোন মাইক ছাড়াই সব শব্দ সব দর্শক এর কানে পৌঁছে জায়। এখানে কুদরত, গদর সিমলা মিরচ এর মত অনেক সিমেমা শুটিং হয়েছে। এখানে আনুপম খের, নাসিরুদ্দিন সাহর মত বড় বড় বলিহড আভিনেতা আজো থিয়েটার করতে আসেন। আমরাও স্টেজ এ উঠে একটু অভিনয় করার চেষ্টা করলাম। এই থিয়েটার এ দোতলায় আছে পুরনো সিমলার অনেক চিত্র। সেগুলি না দেখলে সিমলার অনেকটাই বাকি থেকে যাবে।

সন্ধ্যা ৫টা ৩০মিনিট- এখন আমরা সিমলা ম্যল এ। অসাধারন চারিদিকের আবহ একটা মোহ তৈরি করে। গোধূলির রঙে রাঙান পশ্চিমে সূর্যি মামা মুখ ঢাকছে পাহাড়ের বুকে। জোনাকির মত ফুটে উঠছে সিমলা রানির বুকে অসংখ্য বাড়ি ঘরের বাতি। আলো আঁধারে মেশা ম্যল জেগে উঠল কৃত্রিম আলোর সাজে। ম্যল এর রূপ বদলে গেল এক নিমেষে। ওই তো চিনার গাছের নীচে এক ঝাঁক তরুণ তরুণী সান্ধ্য আড্ডায় ব্যস্ত্য আর একদিকে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে থাকা ক্রাইস্ট চার্চ এ মায়াবী হলুদ রঙ্গের বাতি জ্বলে উঠল। ম্যল এখন তারুন্যে টকবক করছে। মাঝে মাঝে হাড় হিম করা ঠাণ্ডা বাতাস রোমকূপ গুলকে সজাগ করে দিয়ে যাচ্ছে। পতপত করে উড়ছে ভারতের জাতীয় পতাকা। এই তো ভারত আর এটাই তো সেই স্বর্গ।

সন্ধ্যা ৭ টা – ধিরে ধিরে ফিরে চললাম আমাদের থাকার জায়গা সিমলা কালিবারির দিকে। সান্ধায় কালীবাড়ির রূপ আরও খুলে গেছে। আর কালীবাড়ি থেকে সিমলা এক কথায় অসাধারণ। কালীবাড়ি আজ আর নয়। নতুন সকাল শুরু করব এখান থেকেই।

রাত ৯ টা – কালীবাড়ির ক্যান্টিনে ডিম, ভাত আর তরকারি সঙ্গে চাটনি পাঁপড় সহযোগে রাতের খাওয়া তা এক কথায় লা জবাব। মায়াবী সিমলার বুকে ফুটে ওঠা তারাসম আলোক বিন্দুর দিকে তাকিয়ে আজকের দিনটা সেস হল।



3rd May, 2017:

সকাল ৭টা- রাতএ দুটো কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়েছিলাম। উঠতে একটু দেরি হয়ে গেল। আর আজকের ঘুম ভাঙল একটা পবিত্র ঘণ্টা ধ্বনি শুনে। প্রথমে ঘুম থেকে উঠে ভাবতে থাকলাম কোথায় আছি। তারপর মনে হল আমি আছি সিমলা কালীবাড়িতে ওই ঘণ্টা ধ্বনি আসছে এই কালীবাড়ির মন্দির থেকেই।

সকাল ৭টা ৩০ মিনিট – মুখ হাত পা ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। কালীবাড়ির ক্যন্টিনে চা জলখাবার এর দারুন ব্যবস্থা আছে। কাল ম্যল এ সন্ধ্যা দেখেছি আজ বাইরের রোদ ঝলমলে আকাশ ডাকছে সিমলার বাকি জায়গা গুলো দেখার জন্য।

সকাল ৮ টা – কালীবাড়ির সামনে এসে দেখলাম সিমলার বাকি পর্যটক রা মায়ের কাছে পুজা দিতে ব্যস্থ। মনে হল এই মন্দির সম্পর্কে একটু জানতে পারলে বেশ হয়। চলে গেলাম অফিস এ। ওখানে থেকে জানানো হল বিকাল ৫ টায় সেক্রেটারি বাবু আসবেন। তখন গেলে তিনি সব বলবেন।

সকাল ৯টা – সব্বাই স্নান সেরে বেরিয়ে পরলাম ম্যল এর উদ্দেশ্যে। গুটি গুটি পায়ে সিমলা পোস্ট অফিস এর পাস দিয়ে ম্যল এ উঠলাম। সকালের ম্যল আরও প্রানবন্ত আরও উচ্ছল। রং বেরং এর শীত বস্ত্রের আবরণে মানুষের ঢল লক্ষণীয়। সাথে আছে কিন্নরী পোশাক পরে ফটো তোলার হিরিক। বেশ ঝলমলে ব্যপারটা।

সকাল ১০টা- ম্যল ছেড়ে এগিয়ে গেলাম ক্রাইস্ট চার্চ এর দিকে। আমরা যাব জাখু পাহাড় এর উপর জাখু মন্দির আর জাখুর ১০৮ ফুট মূর্তি। চার্চ এর পাশে অনেক গাড়ি আছে যারা ৩০০-৫০০ টাকায় প্রতি ৪-৫ জন পিছু জাখু মন্দির নিয়ে যায়। তবে সবথেকে ভাল উপায় হল HPTDC এর গাড়ি। ১০-১১ জন যেতে পারেন একবারে যা জাখু থেকে সিমলা ম্যল আপ ডাউন করে। ভাড়া মাথাপিছু ২০ টাকা একপিঠের জন্য। আমরা সেই গাড়িতে যাত্রা শুরু করলাম জাখু মন্দির এর উদ্যেশ্যে। পাহাড়ি খাড়া পথে গাড়ি উপরে উঠছে। পায়ে হেঁটে আসার ও উপায় আছে আর আছে রোপ ওয়ে তবে তা অতি খরচ সাপেক্ষ।। সিমলার প্রাণকেন্দ্র ম্যল কে নিচে রেখে ১০-১৫ মিনিটে এসে গেলাম জাখু মন্দির। কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে যেতে হবে মন্দির আর জাখু মূর্তির পাদদেশে। তবে খুব খুব সাবধান কারণ এখানকার অসংখ্য বাঁদর এর দল অত্যন্ত অবাধ্য। আপনার হাথে কিছু থাকলে (চশমা, মোবাইল, ক্যামেরা ইত্যাদি) তা ধরে এরা টানাটানি করবেই।

সকাল ১১ টা- আমরা ঠিক করলাম হেঁটে ম্যল এ নামব। সবাই হাঁটা পথ নিলাম। জঙ্গল ঘেরা পাহাড়ি পথে নামতে আপনার মন্দ লাগবে না।

দুপুর ১২টা- আমরা আবার সিমলা ম্যল এ। প্রনবন্ত ম্যল। অসংখ্য মানুষের আনাগোনা আর কোলাহলে মুখরিত। কিছু সময় কাটিয়ে আমারা আবার এগিয়ে গেলাম সিমলা কালীবাড়ির দিকে।

দুপুর ১টা- কালীবাড়ি পৌঁছে আমাদের প্রথম কাজ ছিল খেয়ে নেওয়া। কালীবাড়িতে ভাত ডাল মাছ ডিম এর সাথে মটন টাও অগ্রিম বুকিং এ পাওয়া যায়। দুপুর এর খাওয়া শেষ করে আমরা আমাদের রুম এ একটু বিস্রাম নিতে গেলাম।

বিকাল ৫টা- আগের এপইন্টমেন্ট অনুযায়ী আমরা এলাম কালীবাড়ির সেক্রেটারি ডঃ কল্লোল প্রামানিক এর কাছে। উনি কালীবাড়ি নিয়ে অনেক গল্প শোনালেন। শোনালেন এই মন্দির এর প্রতিষ্ঠা করার গল্প। এখানকার দুর্গা পুজা, কালী পুজা সব বিষয়ে। ( Click https://youtu.be/xNrouvGO-FA for direct interview of Dr. Kallol Prananik). এখানে ক্লিক করে জেনে নিন কালীবাড়ি সম্বন্ধে তাও সেক্রেটারির কাছে থেকে।

সন্ধ্যা ৬টা- আবার এলাম ম্যল এ। মায়াবী ম্যল বার বার আমাদেরকে টেনে নিয়ে আসছে তার বুকে। ২ টো আসাধারন দিন কাটালাম এই সিমলায়। পরের দিন আমাদের নতুন যাত্রা শুরু হবে। ১১ জনের জন্য গাড়ি আসবে টেম্পো ট্রাভেলার।

4th May, 2017:

সকাল ৫টা- ঘুম ভাঙল মোবাইল এর অ্যালার্ম এর ডাকে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, কালী বাড়ির ঠিক নিচের অংশ ম্যল রোড এ গিয়ে মিলিত হয় এবং এ রাস্থায় গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ থাকে সকাল ৭ টার পরে। তাই সকাল ৭ টার পরে গাড়ি উঠতে গেলে আমাদের হয় যেতে হবে সিমলা স্ট্যন্ড নয়ত কালীবাড়ি থেকে ১ কিমি নিচে নেমে রাস্থায়। তাই আমরা ঠিক করলাম সকাল ৬ টায় কালীবাড়ির সামনে থেকে গাড়ি উঠব। সেই মত কালীবাড়ি তে জানিয়ে রাখলাম এবং কালীবাড়ি থেকে বলা হল আমরা যেন সেকিউরিটি র কাছে ঘরের চাবি দিয়ে যাই। তাই আমাদের এত ভোরে ঘুম থেকে ওঠা।

সকাল ৬ টা- আমরা কালীবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় এলাম এবং ঠিক কথামত আমাদের গাড়ি এসে দাঁড়াল সিমলা স্টেট ব্যঙ্কের সামনে। আমরা সবাই গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু করলাম। আমরা আজ যাব কিন্নর জেলার সুন্দরি গ্রাম সাংলা তে। দূরত্ব প্রায় ২২৩ কিমি। ৭-৮ ঘণ্টা লাগবে আমাদের সাংলা পৌঁছাতে।

সকাল ৭টা- সিমলা ছেড়ে আমাদের পথ এন এইচ ২২ ধরে এগিয়ে চলেছে। ১৬ কিমি এসে আমাদের গাড়ি বড় রাস্তা ছেড়ে বাক নিল চড়াই পথে। আমরা এসে গেলাম সিমলা অঞ্চলের সবথেকে উচ্চতম স্থান কুফরি তে। বলাই বাহুল্য এত ভোরে আমরা ছাড়া এখানে আর কেউ নেই। শান্ত ঘুমন্ত কুফরি ধীরে ধীরে সকালের মিঠে রোদের স্পর্শে জেগে উঠছে। হাড় হিম করা ঠাণ্ডা বাতাস আর ঝলমলে রদ্দুর এক আলাদা অনুভুতির সৃষ্টি করেছে। এখানকার যা যা দেখার যেমন চিরিয়াখানা, পার্ক তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এবারের মত কুফরি তার একান্ত শান্ত স্নিগ্ধ রুপেই ধরা দিল আর জাগিয়ে রাখল তার চেনা পরিচিত রুপের স্বাদ আস্বাদন এর খিদে।

সকাল ৮টা- আমাদের আজ অনেক পথ যেতে হবে তাই কুফরির চেনা ছবি দেখার জন্য ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করা গেলনা আমরা আবার গাড়িতে উঠে পরলাম। কুফরি ছেড়ে আমাদের গাড়ি পেট ভরে খাবার খেল আর আমরাও গাড়িতে বসেই সকালের টিফিন সেরে নিলাম।

সকাল ৯টা- ওই , ওগুলো কি পরে আছে সবুজ উপত্যকায়? প্রশ্ন টা সবার মনেই অনেক্ষন ঘুরছে কিন্তু কেউ উত্তর পাচ্ছিল না। শেষে দেখা গেল। চারিদিকে আপেল গাছের সারি। আর সেই গাছ ভরে আছে আপেল ফুলে। সম্ভবত সেই ফুল যাতে নষ্ট না হয় সেই জন্য আপেল গাছের মাথায় চাপান হয়েছে সাদা পলিথিন এর কাগজ। বড় বড় উপত্যকা আর ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম কে পাশে ফেলে সাপের মত আঁকা বাকা রাস্থায় আমরা এগিয়ে চলেছি।

সকাল ১১টা- এটা গ্রাম নয়। ছোট শহর। নাম রামপুর। পাশে কুলু কুলু শব্দে বয়ে চলেছে সুতলেজ নদী। কিছু আগে আমরা ফেলে এসেছি নারকান্ডা। রাস্তায় কাজ হচ্ছে তাই হটু পিক মিস হল।

দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট – আমরা জেওরি পেরিয়েছি অনেক আগেই। ওখান থেকে সারাহান এর পথ। খিদে পেয়েছে সব্বার। আমাদের ড্রাইভার এসে দারালেন এক পাঞ্জাবি ধাবায়। ভাত, রাজমা, আচার আর বেগুনের কারি। এটা দিয়েই দুপুরের ভোজ সারা হল।

দুপুর ২টা- ধীরে ধীরে রাস্তার চারিদিকের প্রকৃতি পরিবর্তন হতে থাকল। সবুজের আস্তরণ ধীরে ধীরে কমে ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে। সুতলেজ এর যে পার ধরে আমরা চলেছি ঠিক তার উল্টো পারে হঠাত দেখলাম ধূসর পাহাড় হুর মুর করে ধসে পড়ছে আর ওই পারের রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়ে সমস্ত গাড়ি থেমে গেল। বুকের ভিতর টা কেপে উঠল। তবে সেই ভয় নিমেষে উবে গেল যখন সামনে রাস্তার পাশে উচ্ছল বেগে নেমে আসা একটি নাম না জানা ঝর্না কিন্নর জেলায় আমাদের কে স্বাগত জানাল। শীতল স্বচ্ছ জল প্রান টা জুড়িয়ে দিল। কিছু সময় কেটে গেল ঝর্ণাধারার আবেগে।

দুপুর ৩টে- আমাদের গাড়ি এসে দাঁড়াল এক মন্দির এর সামনে। তারান্ডা মায়ের মন্দির। সমস্ত গাড়ি যাওয়া বা আসার পথে এই মন্দির এ পুজা দিয়ে যায়। এখানকার মানুষের বিশ্বাস তারান্ডা মা এই পথের সমস্ত বিপদ থেকে সাবাইকে রক্ষা করে। এখানে সাধারন যাত্রীদের জন্য রয়েছে শৌচাগার।

বিকাল ৪টে- আমরা এখন কারছাম। এ স্থান সুতলেজ এবং বসপা নদীর মিলনস্থল। আর এখানে তৈরি হয়েছে JSW এর বিরাট ৩০০MW এর জল বিদ্যুৎ প্রকল্প। এ এক বিশাল কর্ম কান্ড। দেব ভুমি হিমালয়ের বুকে ভগবানের তৈরি কান্ড কারখানা এতক্ষণ দেখার পর মানুষের কর্ম কান্ড ও কিছুমাত্র কম নয়। আমাদের পথ এবার বাঁক নিল বাসপার পার ধরে। পথ আরও বন্ধুর থেকে বন্ধুর হতে শুরু করেছে। বুকের ভিতর ভয় থাকলেও বসপার উপত্যকা ধরে বরফ মোরা পর্বত রাজির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মন থেকে ভয় কখন যে ধুয়ে মুছে গেছে বুঝতেই পারিনি।

বিকাল ৫টা- এই মাত্র সাংলা পৌঁছলাম। ছোট্ট কিন্তু বেশ জমজমাট এক জনপদ। সামনে বিস্তীর্ণ বসপা উপত্যকা, বরফাবৃত প্রবতারাজি আর আপেল বাগান নিয়ে সাংলা ভারতের পর্যটন মানচিত্রে তার স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে। আমরা হটেল এ পৌঁছে চলে এলাম হটেল এর ছাদে। এ রুপের আর বর্ণনা হয় না। সোনা গলে পড়ছে পাহাড়ের মাথায়। বিকালের পড়ন্ত সোনা মাখা রদ্দুর এক মায়াবী দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। অবাক হয়ে ঠাণ্ডাকে উপেক্ষা করে সূর্য কে আজকের মত বিদায় জানালাম। ঘড়িতে এখন সন্ধ্যা ৭টা...।।



5th May, 2017:

সকাল ৬টাঃ ঘুম টা অনেক আগেই ভেঙ্গে গেছে। তাও ফটো আর ভিডিও করার তাগিদে নাহলে এই ২-৩ ডিগ্রি টেম্পারেচার কে উপেক্ষা করে কে বিছানা ছারত? ভোর ৫টায় জানালার পর্দা সরিয়ে যে দৃশ্য চোখে এল এর পর আর চোখে ঘুম আসে না। কাল আঁধার ঠেলে ঠিক পাশেই ঝকঝকে সাদা কিন্নর পর্বত শ্রেণী। ক্যামেরা টা ভিডিও মোড করে রেখে দিলাম। ধীরে ধীরে সাদা বরফে ঢাকা শৃঙ্গ সোনালী আভায় ঝলসে উঠল। স্বর্গীয় সে দৃশ্য, স্বর্গীয় সে অনুভূতি। সকাল ৬টায় বিছানা ছেড়ে এলাম উল্টো দিকের বারান্দা তে। বসপা উপত্যকা জেগে উঠছে। মাথায় সোনার মুকুট পড়ে ঝকঝকে একটা দিন শুরু হচ্ছে। চারিদিকে আপেল খেতের সমারহ। সবাই খুব জলদি রেডি হতে শুরু করলাম।

সকাল ৮টা ৩০ মিনিটঃ এই ঠাণ্ডায় তারা দিলেও খুব তাড়াতাড়ি রেডি হওয়া গেল না। আমরা এই গাড়িতে উঠলাম। আমরা যাচ্ছি ভারতের শেষ গ্রাম ছিটকুল। অনেকদিন থেকে বইয়ে পড়েছি ছিটকুল সম্বন্ধে। আজ অনেক দিনের একটা স্বপ্ন ছুয়ে দেখব। আর তর সইছে না, মনে হচ্ছে ছুট্টে চলে যাই তিব্বতের সীমান্তে স্বপ্নের গ্রাম ছিটকুল এ।

সকাল ১০টাঃ ছিটকুল যেতে আর বেশি বাকি নেই ১০-১৫ মিনিটে পৌঁছে যাব। কিন্তু রাস্তার এই প্রাকিতিক শোভা আমাদের চলতে দিল না। সবাই গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়লাম। এটাই ত স্বর্গ, এটাই ত জীবনের লক্ষ। বস্পা নদী কে পাশে নিয়েই আমাদের পথ এগিয়েছে সাংলা থেকে ছিটকুল এর দিকে। চারিদিকে আপেল খেত, সামনে বরফ মোড়া পর্বত শৃঙ্গ অপরূপ রাস্তার শোভা এই নিয়ে পথ এগিয়েছে। মাঝে একটা চেক পোস্ট আছে মিলিটারিদের। জায়গাটার নাম মাস্তারাং, ওখানে দেখলাম বস্পার ধারে অনেক তাঁবু ফেলা। শুনলাম ওখানে ওই মনরম পরিবেশে রাত্রি বাস এর ব্যবস্তা আছে। সামনে বরফ মোড়া পর্বত শৃঙ্গের দিকে পায়ে পায়ে কিছুটা এগিয়ে গেলাম।

সকাল ১০টা৩০মিনিটঃ কিছুক্ষণ আগে ছিটকুল পৌঁছেছি। অসাধারণ ছবির মত প্রেক্ষাপটে আঁকা এক জনপদ। ছোট বেলায় রং তুলি নিয়ে যতবার আঁকতে বসতাম অজান্তেই কতবার যেন এই ছিটকুলকেই এঁকে ফেলেছি। অনন্য, অনবদ্য, অপরূপা ছিটকুল। এখন পুরনো কাঠের বাড়ি, মন্দির প্রায় ভগ্নাবশেষ, একটু আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে বইকি। তৈরি হয়েছে হোটেল। তবে সবকিছু কে ছাপিয়ে বরফ মোড়া কিন্নর পর্বতের মাঝে দিয়ে বয়ে চলা স্রোতস্রিনি বস্পা অপরূপা। বস্পার ধারে ছবির মত একটি স্কুল। কচি কাচারা খেলা করছে সেই স্কুল এর মাঠে। পাশে অনেক তাঁবুও দেখতে পাচ্ছি, পর্যটক দের রাত্রিবাসের জন্য।

সকাল ১১টা ৩০মিনিটঃ আমরা ধীরে ধীরে বস্পার তীর ধরে এগিয়ে গেলাম। একটি ব্রিজ পেলাম নদীর উপর। নদী পেরিয়ে আবার হাঁটতে থাকলাম, পাশেই পাইন এর জঙ্গল। একীসের স্তুপ? ধুল সরিয়ে দিতেই আমাদের চোখ চক চক করে উঠল। এত বরফ, হাথের নাগালে। ব্যস, বরফ নিয়ে খেলা শুরু হল। বেশ অনেকক্ষণ।

দুপুর ১টাঃ হাপিয়ে পড়েছি। তাও মন জেতেই চাইছে না এ স্থান ছেড়ে। কেমন যেন বাঁধা পড়ে গেছি। আকাশ দিয়ে মেঘের দল উড়ে চলেছে কোন জানা অজানা দেশে। ভারতের শেষ সিমান্তে আমরাও এক ঝাঁক পাখি। ঈশ যদি পাখিদের মত ডানা থাকত। নেই যখন কি আর করা যাবে, ফিরে চললাম সাংলার দিকে।

বিকাল ৩টেঃ সাংলা পৌঁছে খেতে বসেছি। খুব খিদে পেয়েছিল। ভাত, ডাল , আলু পোস্ত ডিমের কারি। অতি উত্তম। আজ আর কোথাও নয়। শুধু হটেলের ছাদে বসে পড়ন্ত বেলায় সোনা রোদের খেলা দেখব ওই শ্বেত শুভ্র বরফের উপর।

6th May, 2017:

সকাল ৬ টাঃ ঘুম থেকে আবার উঠে পরলাম একটু তারাতারি। সাংলার সকালটা খুব অদ্ভুদ। দুরের পাহাড় গুলো থেকে যেন সোনা গলে পড়ছে। ২বার টাইগারহিল এ গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার আশায় দাড়িয়ে থেকে আশা হত হয়েছি। হোক না এটা কিন্নর তবুও এই মায়াবী দৃশ্য কোনমতেই মিস করা যাবে না।

সকাল ৯টা ৩০মিনিটঃ আমরা হোটেল থেকে এই বের হলাম। বেশ ঠাণ্ডা বাইরে। রাত্রে নাকি ২ ডিগ্রি ছিল। ব্যগ প্ত্র গুছিয়ে নিয়ে গাড়ি ছারল। আমাদের এবারের গ্নতব্য কল্পা। মহাদেবের আপন দেশ নাকি এই কিন্নর সুন্দরী। পথ আবার বস্পা ধরে ফিরে চলল।

সকাল ১১টাঃ আমরা এখন ছোট্ট অথচ ব্যস্ত ছবির মত সুন্দর শহর রেকংপিও তে। আমরা কল্পা থেকে আবার এলাম কারছাম। এখান থেকে পথ আবার সুতলেজ এর ধার ধরে। যত এগিয়ে চলেছি সুতলেজ এর গতিপথ ধরে সুতলেজ ততই হয়ে উঠেছে উচ্ছল, প্রাণবন্ত। বার বার সুতলেজ এর পথ রোধ করে তৈরি হয়েছে জল বিদ্যুৎ প্রকল্প। এইসব পেড়িয়ে এলাম রেকংপিও, এই অঞ্চলের সবথেকে ব্যস্ত জনপদ। এখান থেকে পথ সোজা গিয়েছে স্পিতি উপত্যকার দিকে। আমরা বাঁয়ে ঘুরে যাব কল্পা। রাস্তা চড়াই পথে সুতলেজ কে অনেক নিচে রেখে উঠে চলেছে কল্পার দিকে।

দুপুর ১২টাঃ রাস্তার প্রকিতি পরিবর্তন হতে থাকল। সামনে মাথা উচু করে দাড়িয়ে কিন্নর কৈলাস পর্বত শৃঙ্গ। সূর্যের আলোয় তার বরফ মাখা মাথা চক চক করে উঠছে। দেখতে দেখতে এখন আমরা কল্পা তে। হটেল এ এসে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে নিলাম। বেশ সুন্দর হটেল টা। সামনে বারান্দা থেকে এখানকার মানুষ জনের জীবনধারা চোখে পড়ছে আর পিছনের বারান্দা থেকে উন্মুক্ত কিন্নর কৈলাস হাথ বারিয়ে ডাকছে।

বিকাল ৩টেঃ আর ঘরে বসে থাকার কোন যুক্তি হয় না। কল্পার এই গ্রাম তার নাম চিনি। সত্যি খুব মিস্টি এই গ্রামের সবটুকূ। মন মাতানো আপেল ফুলের সুবাস ত আছেই। কল্পা হল মহাদেব এর আপন দেশ। সামনের বরফ মোরা কিন্নর কৈলাস এ মহাদেবের বাস। চোখ মেললেই দেখা যায় ৭২ ফুট উচু শিবলিঙ্গ। সময়ের সঙ্গে এই শিবলিঙ্গের রঙ্গের পরিবর্তন লক্ষনীয়। কল্পা এমন একটা জায়গা যা তিব্বতের কাছাকাছি হওয়ায় এখানকার মানুষের মধ্যে মিশ্র ধর্মের প্রভাব দেখা যায়। বৌদ্ধ আর হিন্দু ধর্মের মিলন ঘটেছে এ স্থানে। চিনি গ্রামে প্রবেশ করেই পেলাম একটি বৌদ্ধ গুম্ফা। গুম্ফা থেকে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। ছোট্ট একটা স্কুল। স্কুলের মাঠ পেরিয়ে এলাম কোঠি চণ্ডিকা মন্দিরে। মন্দির গঠন শৈলী নজর কারা। কাঠের সঙ্গে ধাপে ধাপে পাথরের মেল্বন্ধনে গড়ে উঠেছে মন্দির। মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে কিন্নর কৈলাস এর দৃশ্য চোখ ধাঁধানো। কোঠি চণ্ডিকা মন্দির দেখে এগিয়ে গেলাম গ্রামের অন্দরে। অপূর্ব কাঠের কারুকার্যমণ্ডিত প্রবেশ দ্বার জানান দিল আরও একটি মন্দিরের উপস্থিতি। আমরা এখন বিষ্ণু নারায়ন মন্দির এ। মন্দির এর কাঠের কাজ তাক লাগিয়ে দেবে। মন্দির চত্বরে আছে কিন্নর কৈলাস এর শিবলিঙ্গ দর্শন এর ভিউ পয়েন্ট। অসাধারন বরফ আবৃত পর্বত রাজি মোহিত করে দেয় সবার মন। সময় বয়ে চলে সেই রুপের দিকে চেয়ে।

বিকাল ৫টাঃ এবার বেড়িয়ে পরলাম কল্পার সমৃদ্ধি সন্ধানে। হ্যাঁ আপেলচাষ হল এখানকার প্রধান জীবিকা। সুতলেজ উপত্যকা আপেল বাগান দিয়ে পরিপূর্ণ। সেই আপেল বাগান চিরে এগিয়ে চল্লাম। চারিদিক আপেল ফুলের মাতাল করা গন্ধে পরিপূর্ণ। সঙ্গে কত নাম না জানা বাহারি ফুলের মেলা লেগেছে চারিদিকে। তিন দিক খোলা উপত্যকা, সামনে কিন্নর কৈলাস, দূরে চিনি গ্রামে দেখা যাচ্ছে মন্দিরের চুড়া। সব নিয়ে কল্পা বরই সুন্দরী।সন্ধ্যা হয় ৭টায় তাই অনেকটা সময় কাটালাম প্রকিতির কোলে। ধীরে ধীরে ফিরে এলাম হটেল এ।


7th May, 2017: সকাল ৬টাঃ প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, বিছানা ছাড়তে মন চাইছে না। দুটো কম্বল গায়ে জড়িয়ে শুয়ে আছি। একটা মিঠে আলো জানলার পর্দা ভেদ করে আসছে। পূবের ঘরে আছি আমরা। তবে কি সূর্যি মামা কোন নতুন রুপে অপেক্ষা করছে। ব্যস মনে হওয়া মাত্র বিছানা ছেড়ে জানলার পর্দা টা এক ঝটকায় সরিয়ে দিলাম। সামনে অপরূপ কি দৃশ্য যে অপেক্ষা করছে সেটা আর ভাষায় বলা যাবে না। সূর্যের লালাভ ছটায় রক্তিম হিমালয় যেন লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। ওই তো দেখা যাচ্ছে ৭২ফুট উঁচু শিবলিঙ্গ রক্ত লাল তার রূপ। ঝকঝকে আকাশ আমাদের তার মহিমায় বশ করে ফেলল। কম্বলের মধ্যে বসেই দেখলাম কিভাবে কিন্নর কৈলাস লালি লজ্জা কাটিয়ে সোনালী মুকুট পড়ে নিল নিমেষে। সকাল ৮টাঃ এক কাপ গরম গরম চায়ে চুমুক দিয়ে সকালের টিফিন টাও সেরে নেওয়ার উপক্রম করলাম। আমরা আজ যাব কল্পার আরও এক সুন্দর গ্রামে রোঘি গ্রাম। সকাল ৯.৩০মিনিটঃ এই গাড়ি ছাড়ল চিনি গ্রাম থেকে। এখন গন্তব্য রোঘি গ্রাম আর পথ গিয়েছে সেই সুতলেজ এর পার ধরে আপেল খেতের মধ্যে দিয়ে।পাশে গভীর গিরি খাত। যতদূর চোখ যায় শুধুই বিস্তীর্ণ আপেল ক্ষেত। খাড়া নেমে গেছে খাত অনেক অনেক নীচে। এ স্থানটিকে সুইসাইড পয়েন্ট বলা হয়। সত্যি কতজন সুইসাইড করেছিল টা বলা যাচ্ছে না তবে সুইসাইড করার এর থেকে ভালো জায়গা আর হতে পারে না। খাত এতটাই গভীর যে নীচের দিকে তাকাতেও ভয় করে। এই স্থান থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম রোঘি গ্রাম এর দিকে। সকাল ১০.৩০মিনিটঃ আমরা এই এলাম রোঘি গ্রাম এ। এক সঙ্কীর্ণ জন জীবন। সহজ সরল মানুষের শান্ত বাসভুমি এই ছবির মত সুন্দর রোঘি। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলাম গ্রামের অন্দরে। এখানেও বিষ্ণু মন্দির দর্শনীয়। সুন্দর কাঠ আর পাথরের মেল বন্ধনে এখানেও তৈরি হয়েছে মন্দির। মন্দির দেখে এগিয়ে গেলাম একটু নিরালায়। চারিদিকে আপেল বাগান। ঝিরি ঝিরি নেমে আসছে বরফ গোলা জল। মানুষজনের সাথে কথা বলে রোঘি গ্রাম এর সমৃদ্ধির ছবিটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। দুপুর ১২টাঃ রোঘি গ্রামে অনেকটা সময় কাটালাম। এবার ফিরে এলাম আবার কল্পা। দুপুরে খিদেটা ভালই পেয়েছিল। পেট ভরে ভাত খেয়ে একটু রেস্ট নিলাম। দুপুর ২টোঃ এবার আমরা যাব চাক্কা। এটা সম্বন্ধে খুব একটা ধারনা ছিল না। এখানে শুনলাম সমগ্র কল্পার জল সরবরাহ হয় চাক্কা নামক একটা হিমবাহ গলা জল দিয়ে। ঘণ্টা ২-৩ হেঁটে পাহাড়ি জল ধারা ধরে হেঁটে সেখানে যাওয়া যায়। ব্যস তবে যাওয়াই যাক। চাক্কা একটি জলধারা যা চাক্কা হিমবাহ থেকে নেমে এসে সমগ্র কল্পা কে জল সরবরাহ করেছে। পায়ে হেঁটে সেই জলধারার সন্ধানে যেতে থাকলাম। পাথুরে চড়াই ভেঙ্গে পথ গিয়েছে চাক্কা জলধারার ধার ঘেঁষে। অসাধরন পথের দৃশ্য মনমুগ্ধজাক। কিন্তু আমরা সে স্থানে যেতে পারিনি, তার আগেই ঘড়ি বলছিল ৫টা বেজে গেছে। অগত্যা ফিরে আসতে হল। সন্ধ্যা ৬.৩০টাঃ আজ আর কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা নেই। অসাধারণ সূর্যাস্ত দেকেছি। খুব ক্লান্ত হেঁটে। একদম অন্ধকার এও চাঁদের আলোয় ঝকমক করছে কিন্নর কৈলাস।


8th May, 2017:

সকাল ৬টাঃ বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম কিন্নর কৈলাস এর ডাকে। এক অজানা নেশা যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে ভোরের সূর্যদয়এর সাথে সাথে। চোখের সামনে সেই অপরূপ রুপ একদম মিস করা গেল না।

সকাল ৮টাঃ আজ কল্পা ছেড়ে আমরা যাব সারাহান এর দিকে, ফিরতি পথে। অনেক টা পথ। দুপুর দুপুর পৌঁছাতে হবে। তাই আর দেরি না করে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। আজ সকালের রোদ ঝলমলে পরিবেশে কল্পাকে বিদায় জানিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম সারাহান এর উদ্দ্যেশে। স্রতস্রিনি সুতলেজ এর পার ধরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম সারাহান এর দিকে কিন্তু আজ সুতলেজ এর রুপ একদম অন্য রকম। তার জলধারা আর পাথর এর সংঘর্ষে এক ভয়াবহ জলাবর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এই সুতলেজ কে সাথে নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে থাকলাম। বড় বড় উপত্যকা আর ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম কে পাশে ফেলে সাপের মত আঁকা বাকা রাস্তায় আমরা এগিয়ে চলেছি। নাম না জানা ফুলের মেলা চারিদিকে। আপেল এর সময় এখন নয়, গাছে গাছে আপেল ফুলের সাদা রং লেগেছে। বাতাসে ম ম করছে মাতাল করা আপেল ফুলের সুবাস। গাড়ি এগিয়ে চলেছে তার আপন পথে এঁকে বেঁকে। পথ ভয়ংকর কিন্তু তার থেকেও সুন্দর ভয়ংকর পথের অসাধারণ দৃশ্য।পাশে কুলু কুলু শব্দে বয়ে চলেছে সুতলেজ নদী।

দুপুর ১২টাঃ পথে আমরা সকালের ব্রেকফাস্ট টা সেরে নিয়েছিলাম। কিছুখন আগেই আমরা এসে পৌঁছেছিলাম জেওরি। এখান থেকে ২৫ কিমি পথ উঠে গেছে সারাহান এর দিকে। কিন্তু বাঁধ সাধল রাস্তার বিরাট ধস। পথ একেবারেই বন্ধ। আর ২ কিমি গেলেই আমরা পৌঁছে যাব সারাহান। কিন্তু কোন উপায় নেই যাওয়ার। রাস্তার উপর ধস নয়, রাস্তাটাই ধসে গেছে। তাই এ রাস্তা ৩-৪ দিনের কমে সারানোর নয়। মন খারাপ সকলের এত কাছে এসেও বোধহয় ভিমাকালি দর্শন হবে না। কিন্তু আজ যাব কোথায়? হোটেল তো সারাহান এ। এত লাগেজ নিয়ে যাব কিকরে। শেষ মেশ হোটেল এ ফোন করলাম। ঊপায় আছে, কিন্তু তাতে ২ ঘণ্টা সময় বেশি লাগবে। কুছ পরোয়া নেই। আমাদের তো থেমে গেলে চলে না। আরও ২ ঘণ্টা ঘুরে আমরা অন্য রাস্তা দিয়ে পৌঁছালাম সতী পীঠ সারাহান এ তখন দুপুর প্রায় ২.৩০টা।

বিকাল ৪টাঃ আগে থেকে হোটেল এ বলা ছিল, তাই দুপুরে খাওয়া জুটল। একটু গুছিয়ে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। বুশাহার রাজাদের গ্রিস্মকালিন রাজধানী এই সারাহান। আর সারাহান এর প্রধান আকর্ষণ ভিমাকালী মন্দির যা এই বুশাহার রাজাদের কুলদেবীর মন্দির। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল এই ভিমাকালীজি মন্দির হল একটি সতী পীঠ। হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে এই পীঠ এ। মন্দির টির গঠন শৈলী ও লক্ষনীয়। হিন্দু ধর্ম আর বৌদ্ধ ধর্মের অসাধারন মেল বন্ধন ঘটেছে মন্দির এর কাঠের কারুকার্যে। সামনে বরফ মোরা শ্রীখণ্ড পর্বত মালা সারাহান কে এই অসাধারন রুপ দিয়েছে। মন্দির গর্ভে ক্যমেরা প্রবেশ নিষিদ্ধ তাই মাতৃ দর্শন করতে হলে আপনাকে আসতেই হবে এই সতী পিঠে। এই মন্দির টি নতুন ভাবে নির্মিত। বুশাহার রাজাদের কুল দেবী মন্দির আজ ও বিরাজমান প্রাসাদ চত্বরে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম প্রাসাদ এর দিকে। এই রাজ পরিবারের ছেলে বীরভ্দ্র সিং ছিলেন হিমাচলের মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৬২ সাল থেকে উনি MLA MP পদ সামলেছেন। পরিবারের সবাই এখন সিমলা তে থাকেন তাই এই প্রাসাদ এখন ফাঁকা। পায়ে পায়ে এলাম সারাহান স্টেডিয়াম এ। অসাধারন চারিদিকের দৃশ্যপট যেন পায়ে বেড়ি পরাতে চায়।

সন্ধ্যা ৭টাঃ সূর্যি ডুবে গেছে একটু আগেই। মন্দির প্রাঙ্গণ ছেড়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে এলাম হোটেল এর দিকে। আজ খুব ক্লান্ত লাগছে। বিশেষ করে রাস্তায় ধস এর কারোনে যে রাস্তা দিয়ে আমরা এসেছি, সেটাকে কোন মতে রাস্তা বলা যায় না। মাঝে মাঝে হৃৎপিণ্ড টা বেড়িয়ে আসছিল। কিন্তু মা ডেকেছে, তাই আমরাও এসে পরেছি ভীমাকালিজির কাছে। যাই হোক, কাল সকালে আবার সেই Dangerous রাস্তা দিয়ে ফিরতে হবে। তারাতারি ঘুমিয়ে পড়ি...

9th May, 2017:

ভোর ৫টাঃ আজ আমাদের যাত্রা সারাহান থেকে মানালি এবং আজ আমরা যে রাস্তা দিয়ে যাব সে রাস্তা শীত কালে বরফের নিচে থাকে। আমরা জলৌরি পাস হয়ে মানালি যাব। সারাহান এর রাস্তায় বড় ধস এর কারোনে আমরা মাটির একটা কাচা রাস্তা ধরে সারাহান এসেছিলাম। সেই রাস্তা এতটাই সংকীর্ণ যে বিপরীত দিক থেকে আসা দুটো গাড়ি পাস করাও বিপদজনক। তাই আমরা আজ খুব ভোরে যাত্রা শুরু করব।

সকাল ৬টাঃ আমরা হোটেল ছেড়ে বেড়িয়ে এসেছি এই মাত্র। মাটির রাস্তা ধরে চলেছি। হাতের কাছেই আপেল গাছ। তবে এ অঞ্চলে আপেল ফুল, কচি সবুজ আপেল এ পরিণত হয়েছে। যে আশঙ্কা নিয়ে আমরা তাড়াতাড়ি বেরিয়েছিলাম, তা সত্যি হল। উল্টো দিকের একটা গাড়ি কে পাস দিতে গিয়ে আমাদের টেম্পো ট্রাভেলার এর একটা চাকা গেল খাদ এর দিকের গর্তে আটকে। বুক কেঁপে উঠল সবার।অন্য গাড়ির ড্রাইভার আর স্থানীয় সকলের চেষ্টায় এ যাত্রায় রক্ষা হল। আমরা এর পর অনায়াসেই নেমে এলাম NH5 এ। আমরা ধরলাম সিমলা রোড।

সকাল ৮টাঃ আমরা কিছুক্ষণ আগে রামপুর পেরিয়েছি। সোজা রাস্তা সুতলেজ এর পার ছেড়ে এগিয়ে গেছে সিমলার দিকে। আমরা সুতলেজ নদী ধরেই এগোতে থাকলাম। এ রাস্তা NH নয়, তাই গাড়ির গতিও কমে এল। ব্রিজ পেড়িয়ে আমরা এগিয়ে যেতে থাকলাম সারাহান থেকে ১১৯ কিমি দুরের জলৌরি পাস এর দিকে।

দুপুর ১২টাঃ আমরা এখন জলৌরি পাস এ দাড়িয়ে। দু একটা ছোট দোকান আর ১০৮০০ফুট উচ্চতায় অবস্থিত মহাকালি মন্দির ছাড়া এখানে কিছু নেই। অসাধারণ পরিবেশ মনমুগ্ধকর। খাবার বলতে ভাত রাজমা নয়ত ম্যগি। একটু পেট কে শান্ত করে, গাড়িকেও রেস্ট দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম মানালির দিকে।

বিকাল ৩টেঃ জলৌরি পাস পেরিয়েই রাস্তার কাজের জন্য আমরা কিছুক্ষন আটকে পরেছিলাম। তাই বেশী এগোতে পারিনি। তবে ঘন জঙ্গল, পাহাড়ি রাস্তা আর এক অদ্ভুত নীরবতা একটু ভয় ভয় দেখায় এ পথ।

বিকাল ৫টাঃ অসাধারণ পরিবেশ। আমরা এতদিনে পাহাড়ে বৃষ্টি পাইনি। আজ পেলাম, তাও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। মেঘ নেমে এল যেন হাতের নাগালে। সন্ধ্যার আগেই সাঁঝের আবহ। রাস্তায় এক পাল ভেড়ার দল আমাদের পথ আটকেছে। মন বাঁধন হারা। সামনেই বিয়াস নদী তে মিশে গেল এক পাহাড়ি নদী সাইঞ্জ। আমরা এসে পড়লাম হাই রোড এ। পেলাম কুলু মানালি টানেল। আসাধারন আধারের বুক চিরে ছুটে চলা আলোর সন্ধানে।

বিকাল ৬টাঃ রাস্তার পাশ দিয়ে কুলু কুলু শব্দে বয়ে চলেছে খরস্রোতা বিয়াস। যেন রাস্তার সাথে মিশে যাবে তার জলের ধারা। বেশ কিছুক্ষণ আগেই কুলু পেরিয়েছি। রাস্তার ধারে অনেক শীত বস্ত্রের শো রুম ও চোখে পড়েছে। সন্ধ্যা পায় আগত। রাস্তার পাশে বেশ বড় বড় হোটেল চোখে পড়ছে।

সন্ধ্যা ৭টাঃ এই হোটেল এ এলাম। রুম এ গিয়ে ফ্রেশ হয়ে একটু মানালি ম্যল না গেলেই নয়। বেশ পর্যটক দের ভীর চোখে পড়ছে। কিন্নর ছিল অপেক্ষাকৃত ফাকা।

সন্ধ্যা ৮টাঃ সিমলার ম্যল এর থেকেও বেশী জমজমাট এই মানালির ম্যল। তবে দৃশ্য গত দিক থেকে সিমলা ম্যল অনেক বেশী সুন্দর। এই এদিকে একটা মেলা দেখছি। হরেক রকম শীত বস্ত্রের সম্ভার। একটু দামা দামি করে নিলে মন্দ নয়। আজ অনেক পথ এসেছি। কালকের জন্য তোলা থাক মানালির বাকি কিছু।

10th May, 2017:

সকাল ৬টাঃ আমরা এখন মানালি তে। কম্বল ছেড়ে বাইরে আসতে মন চাইছে না। কিন্তু কম্বলের মধ্যে থাকার জন্য তো মানালি আসা নয়। গিজারে সুইচ অনেক আগেই অন করে দিয়েছি, কিন্তু জল গরম হতে অনেক সময় নিচ্ছে। তারাতারি রেডি হয়ে নিলাম, আজ যাব রোটাং পাস।

সকাল ৮টাঃ আমরা রেডি হয়ে সকালের চা আর ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়েছি। গাড়ির ড্রাইভার ও রেডি। অনেক গাড়ি লাইন পড়বে এ রাস্তায়, তাই একটু আগে বেড়িয়ে যাওয়া যাক। এত সকালেও মানালি ম্যল কিন্তু বেশ জমজমাট। আমাদের গাড়ি ম্যল ছারিয়ে গিয়ে ডান দিকের রাস্তা ধরল। বা দিকের রাস্তা গেছে হিদিম্বা মন্দির এর দিকে। বিয়াস এর উপর ব্রিজ পেড়িয়ে বাম হাথে আমরা ছুটে চললাম রোটাং পাস এর উদ্দ্যেশ্যে। এ রাস্তা সোজা চলে গেছে লাদাখ। রাস্তার ধারে অসংখ্য রেস্টুরেন্ট আর মোটা মোটা পোশাক এর সম্ভার। এরা পোশাক ভারা দেয় বরফের জন্য। আমরা নিলাম না সে পোশাক। রোদ ঝলমলে একটা পরিষ্কার দিন। চারিদিকে ঝকমক করছে সোনা রোদ। আঁকা বাকা রাস্তায় এগিয়ে চলেছে আমাদের টেম্পও ট্রাভেলার। বেশ রোমাঞ্চ লাগছে।

সকাল ৯টাঃ আমাদের গাড়ি থেমে গেল। না কোনো যান্ত্রিক গোলোযোগ নয়। রাস্তা বন্ধ। কেন বন্ধ তার কারণ খুজতে এগিয়ে গেলাম মিলিটারি চেক পোস্ট এর দিকে। তেমন কোন কারণ তো পেলাম না। তবে শুনলাম রোটাং পাস এ খুব এক্সিডেন্ট বেড়ে জাওয়ায় সুপ্রিম কোট এর নিদ্দেশে এখন রাস্তা বন্ধ। শুধুমাত্র স্থানীয় মানুষ জন আর লাদাখ যাত্রী রা যেতে পারে এ রাস্তায়। খুব খুব মন খারাপ হয়ে গেল। এ জায়গার নাম গুলাবোর। শীত কালে এ স্থানে এলেই অনেক অনেক বরফ পাওয়া যায় কিন্তু মে মাসে এখানে কিছুই নেই। ঘোরার গাড়ি বলছে নিয়ে যাবে কিন্তু তা সারা দিনের ব্যপার।

দুপুর ১২টাঃ রাস্তা না ধরে পাহাড়ের গা বেয়ে আমরা ৩-৪ জন বরফের দিকে উঠতে থাকলাম। কিন্তু কি আশ্চর্য যত এগিয়ে যাচ্ছি বরফ তত দূরে চলে যাচ্ছে। চোখ মেললেই দেখা যাচ্ছে স্নো পয়েন্ট, কিন্তু অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও আবার ফিরে এলাম গাড়ির কাছে। বেশ খিদে পেয়ে গেছে। এটা বাকি থাক, আগে পেট পুজা করা যাক।

দুপুর ১টাঃ রাস্তার ধারে একটা ধাবাতে পেট ভরে ভাত, ফুল কপি, ডাল সঙ্গে চিকেন বেশ ভাল লাগল। এবার গাড়ি চলল সোলাং ভ্যলির দিকে।

দুপুর ২টোঃ আমরা এখন সোলাং ভ্যলি তে। যদিয় শীত কালে এর রুপ একেবারে আলাদা হয়, এখন বেশ মোনোরম। সবুজ গালিচা পাতা বিস্তীর্ণ উপত্যকা। শীত কালে স্কি আর গরমে প্যরাগ্লাইন্ডিং এর জন্য বিখ্যত এই সোলাং। একটা রোপ ওয়ে আছে তবে বেশ দামী (৬০০/- টাকা মাথা পিছু)। বেশ অনেকক্ষণ প্যরাগ্লাইন্ডিং দেখলাম আর ভুট্টা ভাজা খেলাম। দারিন মিস্টি আর সুস্বাদু।

বিকাল ৪টেঃ আমরা এলাম হিরিম্বা মন্দির এ। বেশ সংকীর্ণ রাস্তা, বেশ জনবহুল এলাকায় এই মন্দির। তবে মন্দিরের প্রবেশ দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলে চারিদিকটা পালটে গেল এক নিমেষে। বিশাল উচু উচু পাইন জঙ্গল। সূর্যের আলো এসে পৌঁছাচে না মন্দির এর গায়ে। কাঠ আর টিন এর অসাধারণ এক মন্দির। এটি মাহাভারত এর পঞ্চ পান্ডবএর এক পান্ডব ভিম এর স্ত্রী হিরিম্বার মন্দির। মন্দির দেখে পাশে দেখে নিলাম ঘটত্কচ মন্দির। ঘটত্কচ হল ভীম আর হিরিম্বাএর সন্তান।

সন্ধ্যা- ৬টাঃ আমরা হটেল এ ফিরে বেড়িয়ে পড়লাম মানালি ম্যল এর উদ্দেশ্যে। সূর্যি মামা তখন ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। আলোয় ঝক মক করে উঠল মানালির প্রাণকেন্দ্র। হঠাত চোখে পড়ল ম্যল এর এক প্রান্তে অনেক মানুষ ভীর করে আছে। দেখলাম এক বিদেশী আর তার পরিবার বাদ্য যন্ত্র সহযোগে গান শোনাচ্ছেন। এই আবহ আর তার মধ্যে সুরের মূর্ছনায় ভরে উঠল মানালি। (ভিডিও তে আপনাদের জন্য সেই স্মিতি ধরা আছে)। এখন বাকি আছে কিছু। মানালির এত বড় মার্কেট আর একটু কেনাকাটা হবে না। সবাই কেনাকাটায় লেগে পড়ল। তবে সাবধান যা দাম ওরা বলবে, তার ১/৩ থেকে শুরু করুন দামাদামি।

রাত ১০টাঃ আজ ম্যল এই রাতের ডিনার টা সেরে নিলাম। হোটেল এ ফিরে নিশ্চিন্তে একটা ঘুম। শুভ রাত্রি। কাল এখনও বাকি, আমার হিমাচলের ডাইরির শেষ পাতা।

11th May, 2017:

সকাল ৬টা- ঘুম ভাঙল কিন্তু বিছানা ছাড়তে ইচ্ছা হচ্ছে না। গত কয়েক দিনের স্মিতি গুলো চোখের সামনে ভাসছে। মানালি ছেড়ে আজ আমাদের যাওয়ার কথা এবারের মত হিমাচলের শেষ গন্তব্য মনিকরণ এর উদ্দ্যেশ্যে।

সকাল ৮টা- আমাদের গাড়ির ড্রাইভারের কথা অনুযায়ী কুলু তে শীত বস্ত্রের যে শোরুম গুলো আছে ওখানে অপেক্ষাকৃত কম দামে ভালো শীত বস্ত্র পাওয়া যায়। সেই আশায় একটু তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে পড়লাম হোটেল ছেড়ে। বিয়াস নদীর ধার ধরে আবার এগিয়ে চললাম কুলু ভ্যলির দিকে। অসাধারণ রোদ ঝলমলে আবহাওয়া। ধীরে ধীরে কুলু ভ্যলি পৌঁছে আমাদের ড্রাইভার একটা শাল শোরুম এর সামনে দাঁড়াল। আমরা দোকানে গিয়ে কিছু শীত বস্ত্রের দাম জিজ্ঞাসা করলাম আর বেড়িয়ে এলাম। এবার কারন গুলো বলি। মানালি মার্কেট এ দাম উলটো পাল্টা বলে কিন্তু যদি দামাদামি করতে পারেন তাহলে মানালি মার্কেট সবথেকে ভালো জায়গা কেনাকাটার জন্য। দ্বিতীয়ত এই বড় শোরুম গুলো সব ফিক্স রেট। উদাহরণ স্বরূপ যে টুপিটার দাম মানালি থেকে ১০০ টাকায় কিনেছি সেটার একানে দাম ১২০-১৩০টাকা (ফিক্সড)। তাই যদি পারেন মানালি বেস্ট ফর শপিং।

দুপুর ১২টা- আমরা বিয়াস ছেড়ে পার্বতী নদী ধরে এগোতে থাকলাম মনিকরণ এর দিকে। অবশেষে কিছু সময় পরে আমাদের গাড়ি দাঁড়াল মনিকরণ এর গুরুদ্বয়ারার সামনে। মনিকরণ এম্ন একটা জায়গা যেখানে হিন্দু আর শিখ ধর্মের এক অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটেছে। একদিকে গুরুদ্বয়ারা যেখানে কেউ অভুক্ত থাকে না আর অন্য দিকে শিব পার্বতী মন্দির যেখানে শিব পার্বতীর হারিয়ে যাওয়া কানের মনি খুজে দিয়েছিলেন। অনেক পৌরাণিক কাহিনি জড়িয়ে এ স্থান নিয়ে। গুরুদ্বয়ারার লঙ্গর খানা তে সবাই মিলে আহার শেষ করে একটু ঘুরে দেখলাম মনিকরণ এর বাকি মন্দির গুলো। তবে যেটা সবথেকে আশ্চর্য সেটা হল এখানকার উষ্ণ জলের ধারা। যেখানে আপনি চাল বেঁধে দিলেই ভাত হয়ে যাচ্ছে। লঙ্গর খানার ভাত এই ভাবেই হয়ে থাকে। জল এখানে এত গরম যে নিজে থেকেই ফুটছে। দুই ধর্মের দুই শ্রুতি কথাও প্রচলিত এই উষ্ণ জলের কারন নিয়ে। প্রবিত্রতা চারিদিকে বিরাজমান এ স্থানে, তাই হিমাচল ভ্রমণ মনিকরন ছাড়া অপূর্ণ থেকে যায়।

বিকাল ৪টা- আমরা এখন ভুন্টার এ। আজ এখানে হোটেলএ আমাদের রাত্রিবাস।

12th May, 2017:

আজ সত্যি কোন তারা নেই। আমরা আজ চণ্ডীগড় এর দিকে যাত্রা শুরু করব। আজ আমাদের হিমাচল ভ্রমণের শেষ দিন। চন্দীগ্র থেকে আমাদের কালকা মেল ধরার কথা ছিল। রাতে ট্রেন। তাই আমরা হাথে সময় নিয়ে বেড়িয়ে পরি। যত আমরা পাহাড় ছেড়ে সমতলে আসছি তত আবহাওয়া গরম হতে থাকে। অনেক অনেক স্মিতি আর ভালোলাগা নিয়ে আমার হিমাচলের ডাইরি শেষ করলাম। ভিডিও গুলো আপনাদের জন্য। ভালো লাগলে LIKE & SUBSCRIBE এর আশায় থাকব।

818 views0 comments

Comments


bottom of page