top of page

গিরিডি তে ২ দিন

Updated: Apr 3, 2019

নভেম্বর এ বেড়িয়ে এলাম ঝারখন্ড থেকে। সপ্তাহান্তে মুল গন্তব্য গিরিডি।গিরিডি কে

কেন্দ্র করে চারপাস টা একটু ঘুরে দেখা ছিল উদ্দেশ্য। সত্যজিৎ রায় এর সৃষ্টি প্রফ.

শঙ্কু কে বোধ হয় সবার মনে আছে। বর্তমানে রেডিও মিরচির সানডে সাসপেন্স এর

দৌলতে প্রফ. শঙ্কু আরও বিখ্যত।আর একটু মনে করে দেখুন সেই প্রফ. শঙ্কু এর

বাড়ি ছিল গিরিডি। তো সেই প্রফ. শঙ্কুর দেশ দেখতে যাচ্ছি যা আবার আগের শতকের

মানুষের কাছে হাওয়া বদলের পশ্চিম বলে বেশি পরিচিত ছিল।

গিরিডি এলেই প্রথমেই যে স্থানটার কথা মাথায় আসে টা অবশ্যই ঊশ্রী ফালস। ঊশী

কে নিয়ে কতই না সাহিত্য রচনা হয়েছে। প্রফ শঙ্কুতেও এর উল্লেখ বার বার পাওয়া

যায়। সকালের সোনা মাখা রদ্দুর গায়ে পৌঁছলাম ঊশ্রীর ধারে। গিরিডি থেকে মাত্র ১৪

কিমি দুরেই পাবেন ঊশ্রী ফালস এর তোরণ, অবশ্যই ঝারকন্ড পর্যটন নিগম এর

তৈরি। কিছু এগিয়ে ঊশ্রী টার গর্জন দিয়ে উপস্স্থিতি জানান দেবে। বরাকর নদীর

উপনদী উশ্রী এখানে ঝাপিয়ে পরেছে ৪০ ফিট উঁচু পাহাড় থেকে। সাবধানে আপনি পৌঁছে

যাবেন ঝর্না র মাথায়। অসাধারন কিছু সময় কেটে যাবে উশ্রীর আবেগে। কলকাতা থেকে

ছোট্ট অবসরে পৌঁছে যেতে পারেন ৩১৫ কিমি দুরের গিরিডি তে। ঊশ্রী আপনাকে হতাশ

করবে না। কিছু ফটো থাকল আপনাদের জন্য।


ঊশ্রি ফলস, গিরিডি, ঝারখন্ড

গিরিডি তে এসে শীতের দুপুরে যদি মন পিকনিক এর খোঁজ করে তাহলে সে স্থান এর

একটা সন্ধান দেওয়া যাক। ঊশীর শোভা উপভোগ করে চলে যেতে পারেন গিরিডি থেকে

১০ কিমি দূরে খান্ডলি। পিকনিক আর ১ দিনের ছুটি উপভোগ করার আদর্শ জায়গা।

খান্ডলি ড্যাম কে ঘিরে গরে উঠেছে ছোট্ট পার্ক। পাহাড়ের কোলে সুন্দর এক স্থান।

শান্ত আর সঙ্গে ছোটদের জন্য আছে চিন্ড্রেন পার্ক। পাথর আর কংক্রিট দিয়ে তৈরি

মূর্তি গুলো অসাধারন। আর সব থেকে উপভগ্য হল ড্যাম এর জলে প্যাডেল বোট নিয়ে

ভেসে পড়া। তবে স্পিড বোটের ও ব্যবস্থা আছে। কিছু ছবি থাকল এই পর্বের। গিরিডি

বেরানো এখানেই শেষ নয়.........


খান্ডলি, গিরিডি,ঝারখন্ড


ঊশ্রী আর খন্ডলি দেখে আমরা এলাম মধুবন। গিরিডি থেকে মাত্র ৩০ কিমি দূরে।

পথের পরিবেশ কেমন যেন অচেনা লাগতে লাগল। চেনা ঝারখন্ড হটাত করে রুপ বদলে

ফেলেছে। সুন্দর ঝকঝকে রাস্তা। রাস্তার ধারে সারি সারি বৃক্ষরাজি মধুবনে আমাদের

স্বাগত জানাল। আমরা মধুবনে হটেল নিলাম। ঝাড়খণ্ড পর্যটন নিগম এর যাত্রী

নিবাস। এখানে অনেক হোটেল থুরি ধর্মশালা তবে সেগুলি একটাও বড় বড় হোটেল এর

থেকে কিছু কম যায়না। মধুবন হল জৈন ধর্মবলম্বি মানুষের প্রধান একটা

তীর্থক্ষেত্র। আর এখানে এলেই আপনি একটা মধুবন এর ধর্মীয় বাতাবরণে মিশে

যাবেন নিমেষে। তবে এ স্থানে আমিষ ভোজন একেবারেই নিষিধব।

এবার আসি এখানে কি দেখবেন সেই কথায়। যেহেতু মধুবন তীর্থক্ষেত্র সেহেতু এখানে

আপনি পাবেন অনেক জৈন মন্দির। প্রতিটা মন্দির স্থাপত্যে, ভাস্কয্যে আপনকে মুগ্ধ

করবে। পায়ে পায়ে এগুলো দেখে নিতে পারেন। তবে যে জায়গার উদেশ্যে এই স্থানে আসা

সেই পরেশনাথ যাত্রা ও কিন্তু পায়ে পায়ে। পুরপুরি পরেশনাথ পাহাড় পরিব্রাজন করেতে

আপনাকে হাঁটতে হবে প্রায় ২৭কিমি তাও পাহাড়ের চড়াই রাস্থায়। শুধু পারেশ্নাথ

মন্দির এর জন্য আপনাকে কম করে ১৮কিমি হাঁটলেও চলবে। ভয় পেয়ে গেলেন? যদিও

খুব কষ্টসাধ্য তবে অসম্ভব একেবারেই নয়।বাকি বর্ণনা যেতে যেতে দিচ্ছি।

এতটা রাস্থা হাঁটা র প্ল্যান তাও ভোর ৪টে তে আমরা হাঁটা শুরু করব। তো ৯টার মধ্যে

খেয়ে শুয়ে পড়লাম। প্রত্যাশা মত ভোর ৩.৩০মি এ উঠে তৈরি হয়ে আমরা বেড়িয়ে

পড়লাম। আমাদের দলে ৬ থেকে ৬৫ বছর বয়সের সবাই আছে। অসখ্য ডুলি ভীর। যারা

একেবারেই হেঁটে যেতে পারবেন না তাদের জন্য আছে ডুলি। একটি চেয়ার কে বাঁশের

সঙ্গে বাঁধা। ওজন অনুযায়ী ২ বা ৪জন মানুষ বয়ে নিয়ে যাওয়ার আলাদা ডুলি আছে আর

খরচ ও ৪-১২হাজার পর্যন্ত। অনেক বাঁশের লাঠি বিক্রি হচ্ছে (১০টাকা করে)। তবে

আমরা হটেল থেকেই সবার জন্ন্য লাঠি পেয়ে গেলাম। হাল্কা শীতের আমেজ এ হাঁটা শুরু।

শীতের পোশাক নৈব নৈব চ। কিছুক্ষণ হাঁটলে র গায়ে কিছু রাখাই যাবে না তাই আমরা

কোনও শীতের পোশাক নিলাম না। হোটেল থেকে ৬০০মিটার গিয়ে পরেশনাথ এর তোরণ।


পরেশনাথ হাঁটা পথের শুরু, মধুবন,ঝারখন্ড

এরপর শুরু চড়াই রাস্তা। বোর্ড এ দেখলাম পরেশনাথ ৯কিমি। পূর্ণিমার ভোর। গহন

জঙ্গলএর মধ্যে দিয়ে ঢালাই রাস্থা। বড় বড় গাছের পাতার ফাক দিয়ে জ্যোৎস্না এসে

পড়েছে। এত ভরেও অনেক মানুষ, সার বেধে এগিয়ে চলেছে পরেশনাথ দর্শন করতে। ভাই

তো বলেই ফেলল “ ভগবানএরা কি জায়গা পায়না?” এতো কঠিন জায়গায় তাদের আসতে

হল। চারিদিক অন্ধকার। জোনাকি আর ঝিঝির ডাকে একটা রোমাঞ্চকর পরিবেশ।


কিন্তু কি আশ্চর্য কোন ভয় তো লাগছেনা। মাঝে মাঝে ডুলির দল আমাদের কে পাস

কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আবার আমরা কখন এগিয়ে যাচ্ছি। ১৫-২০ মিনিট চলার পর ২

মিনিট এর বিশ্রাম। পিঠ বেয়ে আমারই শরীর এর ঘাম এর ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল।

পশ্চিমে পূর্ণিমার চাঁদ আর পূর্বে সূর্যের রক্তিম আভা জানিয়ে দিল ভোর আগত। ধিরে

ধিরে আলো ফুটে উঠল। রাস্থার ধারে মাঝে মাঝে আদিবাসি মানুষরা তাদের দোকান খুলে

সাজিয়ে রেখেছে চা, বিস্কুট, শরবত, লেবু, কেক, চিপস আর জলের বোতল। তবে

সমতলের থেকে সব জিনিস ৫ টাকা করে বেশি দামে। সেটাই এখানে স্বাভাবিক। এক কাপ

করে চা খাওয়া যাক। চা খেয়ে যখন সূর্যি মামা উকি দিল তখন আমরা ৩কিমি পথ

এসেছি। এখন ৬কিমি বাকি। একটি পাহাড় পেড়িয়ে আমরা তখন উতরাই তে নামছি।

সামনের পাহাড় এ আমাদের আবার চরাই উঠতে হবে। হথাত পেলাম অনেক দোকান আর

লোকজনের সমারহ। জায়গাটি বিশ্রাম স্থল। নাম গান্ধর্ব নালা। ছোটো জলের ধারা বয়ে

চলেছে এখান থেকে। ৪কিমি এলাম।

গান্ধর্ব নালা পেরিয়ে আর এগিয়ে গেলাম ১ কিমি। এথান পর্যন্ত রাস্থা ঢালাই এবং

একটিও সিড়ি নেই তাই অনেকেই এখন পর্যন্ত বাইক নিয়ে আসে। এর পর শুরু হল সিড়ি

বেয়ে ওঠা। ৪ টে সিড়ি একটু চড়াই সমতল। এই ভাবে চলতে চলতে পেলাম আরও এক

ছোট্ট পাহাড়ি ঝর্না। জায়গাটি বেশ ঠাণ্ডা আর নামটাও শীতল নালা। আমাদের হাঁটা হল

৬ কিমি + ৬০০ মিটার।


পরেশনাথ পাহাড় থেকে অপরূপ দৃশ্য, নীচে মাধুবন

শীতল নালা থেকে পথ দুভাগে বেড়িয়ে গেছে। একটি ডাকবাংলো হয়ে সোজা পরেশনাথ

দূরত্ব ২.৫ কিমি আর একটা সোজা সমিধ শিখর জী ২ কিমি। সমিধ শিখর জী থেকে

একদিকে ১ কিমি গেলে পরেশনাথ মন্দির, একদিকে জল মন্দির আর একদিকে আরও

৪কিমি গিয়ে চন্দ্রপ্রভু মন্দির। যারা সুধুমাত্র পরেশনাথ যেতে চান তারা শীতল নালা

থেকে ডান দিকের পথে যান। তবে সোজা সমিধ শিখর জী থেকে পরেশনাথ গিয়ে ওই পথে

নামা যায় যেটা বেশীরভাগ মানুষজন করে থাকেন। আমরাও তাই করলাম। এই রাস্থায়

আরও অনেক মন্দির ও পাবেন। দিগম্বর জৈন মন্দির, ভিমলনাথ মন্দির, শ্রী নেমিনাথ

মন্দির আর সঙ্গে সমিধ শিখর জী, জল মন্দির তো আছেই। জল মন্দির এ দুপুরে খাওয়া

আর বিশ্রাম নেওয়ার বাবস্থা আছে।

তবে যারা তীর্থ করতে না এসে নিছক বেরাতে আসতে চান তাদের কে বলি অসাধারন এক

অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারবেন এই জায়গায়। শিখর থেকে চারিদিকে তাকালেই আপনি

প্রেমে পরে যাবেন জায়গাটার। এই নিস্তব্ধটা, গহন জঙ্গল আর পাখির কলতান

আপনাকে মুগ্ধ করে দেবে।



আমরা ৯ কিমি হেঁটে ৫ ঘণ্টায় এলাম পরেশনাথ মন্দির এ। এত কষ্ট এত ব্যথা এক

নিমেষে উধাও। মন জুড়ানো শতল বাতাস আপনার ক্লান্তি দূর করে দেবে। কিছু সময়

কাটিয়ে আবার পাড়ি দিলাম মধুবন এর দিকে। উতরাই ভেঙ্গে মধুবন আসতে সময় লাগল

৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। বিকাল হয়ে গেল ফিরতে। পেটে তখন খিদে আর শরীর এ ক্লান্তি।

এবার ফেরার পালা। অনেক স্মিতি অনেক অভিজ্ঞটা এইখান থেকে নিয়ে গেলাম।

আপনিও চলে আসুন। খুব খুব ভাল লাগবে এই কষ্টের ফল।

65 views0 comments

Recent Posts

See All

Comentarios


bottom of page