top of page

দারিংবারির অন্দরে...

Updated: Apr 23, 2019

প্রথমেই জায়গাটা নিয়ে লেখার আগে একটু পরিচিতি টা দিয়ে রাখি। ওরিশার গঞ্জম

জেলার একটা শৈল শহর এই দারিংবারি যা প্রায় ১০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্তিত। শোনা

যায় এখানে শীত কালে বরফের দেখা মেলে যা ওড়িশার এই জায়গাকে কাশ্মির এর সাথে

তুলনা করিয়েছে। তবে এখানকার পাইন জঙ্গলও সেই তথ্য কে অন্য মাত্রা দেয়। যদিও

এই জায়গাটা নিয়ে অনেক আগেই আমি পড়াশোনা করেছিলাম (নিছক পর্যটক হিসাবে)

তাও যাওয়া হয়নি। তার বেশ কয়েক বছর পর জায়গাটা লাইম লাইটে এল ২০১৬-২০১৮

তে। জায়গাটার ক্রেজ বেরে যাওয়াও, অনেকে যাওয়ার জন্য উৎসুক হয়ে পড়ে ইদানিং।

প্রসঙ্গত দারিংবারি যাওয়ার সহজ উপায় হল ট্রেন এ ব্রম্ভপুর স্টেশানে নেমে ছোট

গাড়িতে ১২০ কিমি রাস্তা। সঙ্গে গোপালপুর ত আছেই।

আমি শীতের শেষে জায়গাটা ঘুরে দেখার লোভ চেপে রাখতে পারলাম না। প্রথম যেটা

অসুবিধা তা হল হোটেল। হাথে গোনা মাত্র ৩-৪টে হোটেল আছে দারিংবারি তে। প্রায় ৩

মাস বাকি ছিল আমাদের দারিংবারি ভ্রমণ । আগে হোটেল টাই বুক করে নিলাম।

সবথেকে ভালো ট্রেন হাওড়া যশবন্তপুর সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস। রাত ৮.৩৫ এ হাওড়া

ছেড়ে সকাল ৬টায় ব্রম্ভপুর পৌছায়। ট্রেনের টিকিট ও কেটে নিলাম আগে থেকেই।

মাসটা ছিল ফেব্রুয়ারির শেষ, বাতাসে দক্ষিণা বাতাস ঢুকতে শুরু করেছে অনেক আগেই।

আশা করি দারিংবারি ততটা গরম হবে না। দুর্গা দুর্গা করে বেড়িয়ে পড়লাম আমরা

৮জন। ট্রেন ৭টায় আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিল। খুব বড় স্টেশন একদমি নয়।

গোপালপুর আর দারিংবারি স্টেশান টিকে ব্যস্ত করে রেখেছে। হোটেল বুক করার সময়

গাড়িও বলে রাখা ছিল। একটা বোলেরো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল স্টেশান এর

বাইরে। ব্যস গাড়ি ছুটে চলল। বেশ গরম লাগছে। জানিনা দারিংবারি কেমন হবে। তবে যেটা

বলার তা হল ঝা চকচকে রাস্তা। আমাদের গাড়ি ৮০-৯০তে ছুটে চলেছে ১২০ কিমি দূরের

দারিংবারির উদ্দেশ্যে। আগেই বলেছি জায়গাটির উচ্চতা ১০০০মিটার এর কাছে তাই

আমাদের গাড়ি সমতল ছেড়ে পাহাড়ি পথ নিল। নিছক কাশ্মির অফ ওড়িশা নামটা যে

ফালতু নয় তা এবার বোঝা গেল। অসম্ভব সুন্দর মনোরম প্রাকিতিক শোভা। আমরা

পাহাড়ি ঢাল/ ঘাটি বেয়ে উঠছি। বেশ সংকীর্ণ এ পথ। কেবল ছোট গাড়ির জন্য এ রাস্তা।


দারিংবারির রাস্তা


জায়গাটির নাম সুরাট ঘাটি। চারিদিকে জঙ্গল, বাঁদর দের বাঁদরামি রাস্তায় আর আছে

আদিবাসী মানুষদের সরলতা। আহা প্রান জুড়িয়ে যায়। যত উপরে উঠছি বেশ ঠাণ্ডা

অনুভূত হচ্ছে। শহরের কোলাহল এখনও গ্রাস করেনি সদ্য তারুন্যে উদ্ভাসিত গ্রাম্য

দারিংবারিকে। রাস্তায় সকালের টিফিন সেরেছি আমরা। দারিংবারি তাই যখন এলাম

একেবারে দুপুর। হোটেল এর উষ্ণ অভ্যথনা আর ঝা চকচকে রুম বেশ বেমানান

জায়গাটার সাথে।

সারা দিনের একটা খুব লম্বা সফর এর পরে সবাই ক্লান্ত ছিল। তাই সবার ভাত ঘুম বেশ

ভালোই হল। আবহাওয়া সেরকম ঠাণ্ডা না হলেও, গরম একদমই নয়। বিকালে বেড়িয়ে

পড়লাম দারিংবারির বাজার এ। এখনো সেরকম ভাবে পর্যটক দূষণ থাবা বসায়নি। বেশ

ছিমছাম শান্ত বাজার। সন্ধ্যায় বেশ জমজমাট লাগল। আহামরি কিছু নেই। স্থানীয় মানুষ

জনের চাহিদা পুরনের জিনিস পত্র মুলত দোকান গুলোতে সাজানো। স্থানীয় একধরনের

ডালের বোড়া কিনে খেলাম। চাটনি দিয়ে বেশ লাগল। রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে একটা

ক্লান্তিকর দিনের শেষে ঘুমিয়ে পড়লাম অরন্য ঘেরা দারিংবারি তে।

একটা ঝকঝকে সকাল শুরু হল। বোলেরোটি হোটেল এ যথারীতি সকাল ৭টায় হাজির।

সকালের লুচি আর আলুর দম খেয়ে আমরা সবাই পেটে দম দিয়ে নিলাম। ৮টায় বেড়িয়ে

পড়লাম দারিংবারির রূপ আস্বাদন করতে।

দারিংবারি কে যদি কাশ্মির ভেবে থাকেন তাহলে আমি বলব পাহাড়ের রাণী আর পাহাড়ি

আদিবাসী মেয়ে দুটোকে গুলিয়ে ফেলবেন না। পাহাড়ি এই কন্যার রূপ একেবারে আলাদা।

দেখার থেকে হয়ত অনুভব করা টাই আপনার মনে ধরবে। ঝকঝকে রাস্তা ধরে আমাদের

গাড়ি ছুটে চলেছে। ছোট্ট চারমাথা পেড়িয়ে বায়ে ঘুরল। এমনিতেই জনবসতি অল্প, আরও

ফাকা হয়ে এল পরিবেশ, আরও নির্জন। হঠাত চমকে গেলাম। শাল মহুয়ার জঙ্গল ছেড়ে

আমাদের চারিদিকে সারি সারি পাইন এর জঙ্গল। সত্যি কাশ্মির নাম টাও যথার্থ।

আরও এগিয়ে বেশ খানিকটা গিয়ে আমাদের গাড়ি দাঁড়াল। একটা ঝড় ঝড় শব্দ জানান

দিল এক বারিধারা আমাদের ডাক দিচ্ছে। সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকলাম। জলের শব্দ

টা আরও কাছে আসছে। আরও নিচে এগিয়ে পেলাম এক খুদ্র জলধারা। দাশিং বাড়ি

জলপ্রপাত। খুদ্র এই কারনেই এখন শীতের শেষ, এর আসল রূপ খোলে বর্ষা তে। তবে

পরবেশ টা মন্দ নয়। এ যেন বিভূতিভূষণ এর আরন্যক এর দেশ। ভাগ্যিস আমরা এত

জন একসাথে। নাহলে গা টা ছম ছম করে উঠত।


দাশিংবারি জলপ্রপাত

সিড়ি বেয়ে আবার উঠে এলাম গাড়ির কাছে। গাড়ি আমাদের নিয়ে ফিরে চলল একই পথে।

তবে এবার পথটা আলাদা। যাওয়ার সময় আমরা এই ভিউ টা বোধ হয় কেউ লক্ষ্য

করিনি। গাড়ি দাঁড়াল রাস্তার পাশে। হিল ভিউ পয়েন্ট। পাহাড় শ্রেণী বহুদূর পর্যন্ত

বিস্তৃত। আম জাম কাঁঠাল শাল মহুয়া পলাশ, প্রকিতি উজার করে দিয়েছে দারিংবারি কে।

বেশ কিছুক্ষন উদাস হয়ে গেলাম এই রূপ দেখে। আরও অনেক বাকি, তাই আর নয় চলুন

যাওয়া যাক পরের গন্তব্যে।

গাড়ি এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল পাইন বনে। এ পথে যাওয়ার সময় এই পাইন বনের পাশে দিয়ে

যখন গাড়ি ছুটে চলেছিল, ভাবছিলাম যদি গাড়িটা একটু দাঁড়াত। এখন দেখছি এটাই একটা

টুরিস্ট স্পট। গাড়ি থেকে নেমে ছুটে গেলাম পাইন জঙ্গলের মধ্যে।শিলং কাশ্মির নাকি

দারিংবারি গুলিয়ে যাচ্ছিল। সবথেকে আশ্চর্য লাগছিল এই আবহাওয়া তে এরকম পাইন

বন দেখে। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অজস্র পাইন ফল। পাইন এর মধ্যে দিয়ে

রোদের ঝিকি মিকি এক কথায় অসাধারণ। বেশ খানিকটা সময় কাটানোর পরে গাড়ির

ড্রাইভার এর তাড়ায় আমরা যেতে থাকলাম পরের গন্তব্যে...।।


পাইন জঙ্গল, দারিংবারি

চা বাগান অনেক দেখেছি। সেবার যখন দারজিলিং গেলাম, শিলিগুরি থেকেই চা বাগানের

সারি দেখে মন ভরে গিয়েছিল। তবে মিরিক এর পথে চা বাগানের দৃশ্য জাস্ট ফাটাফাটি।

ভাবছেন হঠাত চা বাগানের গল্প কেন করছি? কারন দারিংবারি এসে প্রথম কফি বাগান

দেখলাম। ড্রাইভার আমাদের কে নিয়ে গেল দারিংবাড়ি কফি আর গোলমরিচ বাগান এ।

টিকিট কেটে এগিয়ে গেলাম জঙ্গলের ভিতর। গাইড করার মত কাউকে পেলাম না। বড় বড়

গাছের জঙ্গল এর মধ্যে সবাই কফি গাছ খুজে বেড়াচ্ছে। কোনটা যে কফি গাছ কেউ

বুঝতেই পারছে না। ভাগ্যিস আমি আগে থেকে দারিংবারি ভিডিও দেখে গিয়েছিলাম তাই

সবাইকে চিনিয়ে দিতে কোন অসুবিধা হল না। ছোট ছোট গুল্ম জাতীয় গাছ। বড় বড় গাছের

ছায়াতে চারিদিকে ছেয়ে আছে। ওটাই কফি গাছ আর বড় বড় গাছ গুলোতে জড়িয়ে লতা

জাতীয় যে গাছ গুলো চারিদিক সবুজ করে আছে। ওটাই গোলমরিচ। সবুজ রঙের থোকা

থোকা গোলমরিচ কে শুকিয়ে নিলেই আমাদের চেনা পরিচিত গোলমরিচ পাওয়া যাবে।

কিন্তু কফি ফল কোথায়? প্রসঙ্গত বলে রাখি চা যেমন গাছের পাতা থেকে তৈরি হয়,

কফি কিন্তু গাছের ফল। অনেক খুঁজে অবশেষে নজরে এল কফি ফল। একটা অন্যরকম

অভিজ্ঞতা হল দারিংবারি কফি বাগানে এসে। বেশ খানিকটা সময় কেটে গেল কফি

বাগানে। এর পর আবার আমরা গাড়ির সওয়ারি হলাম।


কফি বাগান, দারিংবারি

গাড়ি ফিরে এল দারিংবারি চৌমাথা তে। এবার আমাদের গাড়ি অন্য একটা পথে যাত্রা শুরু

করল। ঝা চকচকে পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি। বেশ অনেকটা পথ এসে রাস্তা

ছেড়ে আমাদের গাড়ি বাঁয়ে গিয়ে একটা মাঠে দাঁড়াল। সবাই স্পট খুজতে চারিদিকে

তাকাতেই চমক এল। একটা ছোট্ট ঘেরা জায়গায় বড় বড় এমু পাখির দল। বিরাট বিরাট

গলা বাড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে। হাথ বাড়ালেই খাবারের আশায় ছুটে আসছে। ভয়

পেল যদি কামড়ে দেয়। স্থানীয় আদিবাসি একটা পরিবার এদের দেখাশোনা করে। তাঁদের

একজন তো পাখিদের কাছেই চলে গেল আর আমাদের কেও ডাকল। ভয়ে প্রথমে

যাচ্ছিলাম না। এর পর একবার সাহস করে গিয়ে তো অবাক। এরাই বেশি ভিতু। ওদের

সাথে পোজ দিয়ে ফটো তুলে নিলাম। এর পর একজন হাথে করে সবুজ রঙের পাথর এর

মত কিছু নিয়ে এল আর বলল এটাই নাকি এদের ডিম। বেশ বড় ভারি আর অদ্ভুত একটা

রঙ ডিমটার আকর্ষণ বহু গুন বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এখানে কোনও টিকিট নেই কেউ

টাকা জোর করে চাইবেও না। মানবিকতার খাতিরে ভালোলাগা থেকে এদের কে কিছু দিতে

ভালোই লাগে।


এমু পাখি

এর পর গাড়ি আমাদের নিয়ে গেল লাভারস পয়েন্ট এ। সত্যই ভালোবাসার মত জায়গা।

ছোট্ট একটা জল ধারা উত্তাল হয়ে পাথরে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে বয়ে গেছে। ঝা চকচকে

রাস্তা ছেড়ে খানিকটা মোরাম বিছানো রাস্তা পেড়িয়ে আমাদের গাড়ি নেমে গেল একদম

জল ধারার কাছে। কয়েকটা বাচ্চা ছেলে জলক্রীড়া তে ব্যস্ত। শান্ত পরিবেশ আর ঝিরি

ঝিরি জলের শব্দ মনকে উদাস করে দেয়। সাথে ভালোবাসার কেউ থাকুক বা না থাকুক

জায়গাটাকে অনায়াসেই ভালোবেসে ফেলা যায়।


লাভারস পয়েন্ট

গাড়ি আমাদের নিয়ে এল একেবারে হোটেল এ। দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে বিকাল তিনটা

তে আবার গাড়ি চলে এল আমাদের পরের পর্বের ভ্রমণের জন্য। বিকালে চলে এলাম

দারিংবারি ন্যচার পার্কে। টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম সবুজে ঘেরা পার্কার মধ্যে।

পাহাড়ের ঢালে অসাধারণ প্রকিতির শোভার টানে আমরা কেন অসংখ্য প্রজাপতি ও চলে

আসে। তাই ন্যচার পার্কের মধ্যে আলাদা করে গড়ে উঠেছে বাটারফ্লাই পার্ক। এ যেন

ফুলের ঘায়ে মূর্ছা খাওয়ার জোগাড়। এত ফুল এত রুপ এত শোভা দেখে প্রজাপতি দের

আস্তেই হবে এখানে। বাটারফ্লাই পার্ক মানে এই নয় যে এখানে খাঁচায় কোন প্রজাপতি

আটকে রাখা হয়েছে বরং ফুলের টানে এখানে অসংখ্য প্রজাতির প্রজাপতি ভীর করে যা

এক কথায় অসাধারণ। সময় বয়ে গেল প্রজাপরতির পিছনে ছূটে ছুটে ছবি তোলার আশায়।


বাটারফ্লাই পার্ক


ন্যচার পার্কের উলটো দিকেই আছে দারিং বারি হিল ভিউ পার্ক। এখানে না এলে বোধ

হয় দারিংবারির আসল রুপ দর্শন বাকি থেকে যেত। পাহাড়ের কোলে পাহাড় একে অপরের

হাত ধরাধরি করে আছে। আছে অপূর্ব একটা ভিউ পয়েন্ট আর ফোয়ারা।



যে কারনে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করা তা আর কিছু নয় দারিং বারির স্বর্গীয়

অনবদ্য সূর্যাস্ত উপভোগ করার জন্য। গাড়ি আমাদের নিয়ে গেল দারিংবারি সান সেট

পয়েন্ট এ। সূর্য তখন ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। রক্তিম আভায় চারিদিক ঝকমক করছে।

ধীরে ধীরে পাহাড়ের রেখাগুলো ফূটে উঠছে। একটার পর একটা পাহাড় আলিঙ্গন করছে

নিজেদেরকে আর তার পিছনে সূর্যি মামা বিদায় নিচ্ছে। অসাধারণ পরিবেশ মন উদাস

করে দিল। সূর্যাস্তের পর ফিরে এলাম হোটেল এ।


সান সেট পয়েন্ট

পরের দিন সকাল সকাল সবাই রেডি হয়ে নিলাম। আজ আমাদের গন্তব্য গোপালপুর।

আমাদের ট্রেন আবার রাত ৮টায়। আমরা গাড়ি নিয়ে হোটেল ছেড়ে চলে এলাম সোজা

গোপালপুর। পাহাড় থেকে একেবারে সমুদ্রে। পুরী দিঘার মত ভীর নেই। বাকিটা দিন

সমুদ্রের ঢেউ গুনে কাটিয়ে দিলাম। সন্ধ্যায় এলাম স্টেশানে। ছোট্ট এই ভ্রমণ মনের

মোনিকোঠায় অনেক রঙিন ছবি একে দিয়ে গেল। ছোট অবসরে চলেই আসতে পারেন

দারিংবারি।



248 views0 comments

Recent Posts

See All

Comments


bottom of page