top of page

ভুটানের গপ্পো...। THE STORY OF BHUTAN

Updated: Jun 8, 2019

ভুটানের গপ্পো...। #BHUTAN

(সৌরভ গায়েন)

পর্ব- ১ (প্রস্তুতি পর্ব)

ঘুরে এলাম ভুটান এই এক সপ্তাহ হল। দেশটার সৌন্দর্য নিয়ে অনেক লেখা এখানে আছে, আর আমিও এই লেখাতে সেটাকে কখনই এড়িয়ে যেতে পাড়ি না। তবে আমার এই বিবরণে অনেক Details এ আমি দেশ ভ্রমণ টাকে বিবরণ করার চেষ্টা করব যাতে এখানে বেরাতে যাওয়া নিয়ে কারও মনে কোন প্রশ্ন না থাকে, আর থাকলেও আমি ত আছি।



তবে প্রথমেই তাঁদের কে বলি যারা এই দেশ ভ্রমণ কে অনেক Costly Tour বলে খাতা থেকে দূরে সড়িয়ে রেখেছেন, এই ভ্রমণ একেবারেই Costly Tour নয়। আশা করি আমার লেখা পড়ার পরে সেটা বুঝতে পারবেন। কোনো Travel Agent কে ছোট না করে বলছি “দয়া করে আপনাদের লাভের শতাংশ টা ভারতের অন্যান্য জায়গায় বেরাতে যাওয়ার মতই রাখুন, তাহলে অনেক বেশী পর্যটক এই অসাধারণ দেশটাকে উপভোগ করার সুযোগ পাবে। যে দেশটার অর্থনীতির অনেকটা জুড়ে আছে পর্যটন, দয়া করে সেই দেশটাকে সাহায্য করুন”। তবে আমি কোনো Agent নই, কোনো রকম প্রয়োজনে Just একটা Massage করতে পারেন, সাহায্য পাবেন।

অনেক বলে ফেলেছি এবার আমার গপ্পে আসি। গপ্পের মাঝে মাঝে তথ্য দিলে অনেক ভাল লাগবে। দেখা গেছে যারা একবার এই দেশটায় বেড়িয়ে এসেছে তার ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ আবার এখানে যাবে বলে মত পোষণ করেছে। আমার এক পরিচিত কাকু এরকম বললেন আর আমরা ভুটান বেরাতে যাব ঠিক করলাম। আমার পরিবারের ৭ জন আর ওই কাকু মিলে ৮জন। আমি ভিড়ে বেড়ানো ঠিক পছন্দ করিনা তাই কালি পুজার পরে প্ল্যন করে ফেললাম। খোজ খবর শুরু। সে বিষয়ে ফেসবুক এর একাধিক গ্রুপ থেকে অনেক সাহায্য পেলাম। প্রথমে শিয়ালদহ থেকে আলিপুরদুয়ার গামী কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস এ হাসিমারা পর্যন্ত টিকীট কেটে নিলাম। যদি আকাশপথে যাওয়ার সামর্থ না থাকে, তাহলে ভুটান যাওয়ার সবথেকে সহজ উপায় হল হাসিমারা যাওয়া। এখান থেকে ২০কিমি গিয়ে পাবেন ভুটান এর গেট। টিকিট কাটার বেশ কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর আমার এক বন্ধু আর তার ঘরণী ওই একি ট্রেন এ টিকিট কেটে আমাদের সাথে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল। আমরা এখন ১০, সেই মত খবর নেওয়া শুরু হল। আমার যে কাকু আগেই একবার ভুটান বেড়িয়ে এসেছেন তিনি কিছুই আগে থেকে বুক করতে রাজি নন। “আগে থেকে বুক করলে অনেক টাকা বেশী নেয়, ওখানে গিয়ে ৮০০-১০০০টাকায় আমরা ভালো ভালো হোটেল পেয়েছিলাম, গাড়িও খুব কমে। তাই আমরা সব গিয়েই করব” কাকু বললেন। তবে আমি ভুটান এর হোটেল সাইট http://www.hotel.bt/ চেক করে দেখলাম ১৫০০টাকার নিচে সেরকম হোটেল নেই বললেই চলে। যারা ওখানে ১২০০ লিখে রেখেছে তাড়াও Whatsapp এ ১৫০০ বলছে, সে হোটেল এর ছবি আর রিভিও মোটেই ভাল নয়।

বেশ এভাবেই ৩মাস কেটে গেল। দুর্গা পুজা এল গেল, কালি পুজাও এল, চলেও গেল, বিপদ হল ঠিক বেড়াতে যাওয়ার ১ সপ্তাহ আগে। বিপদ বলতে আমার ওই কাকু অফিস এ ছুটি পাবেন না। অর্থাৎ আমার পরিবার আর আমার বন্ধুর পরিবার (৯জন) কে নিয়ে ভুটান যেতে হলে যা কিছু করতে হবে আমাকেই করতে হবে। আর বেশিরভাগ মানুষের মতই আমি মাথায় চিন্তা নিয়ে যেতে রাজি নই। নতুন দেশ, একেবারেই অজানা, সেখানে রাস্তায় পরিবার ফেলে হোটেল খুঁজব? মুশকিল আশান করল ফেসবুক এর ই একটা গ্রুপ। ওখান থেকে একটা হোটেল এর মালিক এর Whatsapp নম্বর পেলাম আর যোগাযোগ করলাম। উনি সমস্ত হোটেল খুব কমেই বুক করে দেবেন বললেন। সঙ্গে গাড়ির নাম্বার ও দিলেন। সেখানে যোগাযোগ করে গাড়িও পেয়ে গেলাম খুব কমেই। (গাড়ি, হোটেল, রুম সব ছবি দেব, কিন্তু আমি কারও Advertise করব না, যার দরকার আমাকে মেসেজ করবেন সব বিনা স্বার্থে জানাব।)

এবার আসি পারমিট এর ব্যপারে। শুনেছিলাম পারমিট করতে ১-২ ঘণ্টা সময় লাগে আর লাগে ১. ভোটার কার্ড এর জেরক্স ২. ২ কপি পাসপোর্ট ফটো ৩. হোটেল বুকিং স্লিপ। কাঞ্চনকন্যা হাসিমারা পৌছায় সকাল ১০টা ৪৬মিনিট এ। কিন্তু ১ ঘণ্টা দেরি করেই। যদি আরও দেরি করে তাহলে দিনে দিনে পারমিট করে ভুটান এর রাজধানী থিম্পু তে ৬ঘণ্টা Journey করে যাওয়া সম্ভব নয়। সেই মত আমাদের প্ল্যন ছিল-

Day-1: Reached Hasimara, proceed permit stay at jaigaon.

Day-2: Moved to Thimpu, stay at Thimpu.

Day-3: Thimpu sight seen.

Day-4: Thimpu to punakha, back to Paro.

Day-5: Paro Tiger nest Trekking.

Day -6: Chele la & Haa, stay at Paro.

Day-7: back to Hasimara.

আমাদের গাড়ির ড্রাইভার এখানেও পরিবর্তন আনলেন। বললেন দিনে দিনে পারমিট করে থিম্পু চলে যাবেন, সেটা ওনার দায়িত্ব। এতে একটা দিন সেভ হবে আর অনেক রিলাক্স হয়ে বেরানো যাবে। আমাদের প্ল্যান যা হল-

Day-1: Reached Hasimara, proceed permit moved to Thimpu.

Day-2: Thimpu sight seen.

Day-3: Thimpu to punakha, Stay at Punakha.

Day-4: Punakha to Paro, Paro Sight seen.

Day-5: Paro Tiger nest Trekking.

Day -6: Chele la & Haa, stay at Paro.

Day-7: back to Hasimara.

সেই মত আমরা যাত্রা শুরু করলাম গত ২৫শে নভেম্বর,২০১৮। শিয়ালদহ থেকে ট্রেন যথা সময়ে ছেড়ে দিয়ে আমরা পরের দিন ২৬শে নভেম্বর, ২০১৮ সকাল ১১টায় হাসিমারা চলে এলাম। যথারীতি গাড়ি আমাদের জন্য স্টেশন চত্বরে অপেক্ষা করছিল। আমরা সময় নষ্ট না করে গাড়ি উঠে যাত্রা শুরু করলাম ফুটসিলিং এর দিকে। এখানে মনে রাখবেন ভুটান এর সময় আমাদের থেকে ৩০মিনিট এগিয়ে, আর সেই সময় অনুযায়ী ১টা থেকে ২টা অফিস বিরতি তে থাকে। আমরা সমস্ত ফর্ম রেডি করে অপেক্ষায় থাকলাম ভুটানের ঘড়িতে ২টো বাজার। প্রথমে ফর্ম ভেরিফিকেশান হয়। সমস্ত ঠিক থাকলে দোতলায় পাঠিয়ে দেয়। (নিজেই সব করুন, কোনো দালাল ধরবেন না।) দোতলায় গ্রুপ এর যে হেড, ফর্ম গুলোকে নিয়ে চলে যান ইমিগ্রেশান অফিশার এর কাছে। প্রসঙ্গত প্রত্যেকের জন্য একটি ফর্ম, একটি করে ভোটার কার্ড/ জন্ম নথির কপি আর একটি করে ফটো লাগে। ইমিগ্রেশান অফিশার আমাকে কি জন্য এসেছি, যারা এসেছে তারা কে হয় (পরিবার/ বন্ধু), কোথায় যাব আর কতদিন এগুলো জিজ্ঞাসা করে স্ট্যম্প করে দিলেন। ৯টা কাউণ্টার আছে। তার একটিতে সবাই দাড়িয়ে পরে একের পর এক Finger print Impression আর photo তুলে ১০ নম্বর কাউন্টার এ যেতে বললেন। ওখানে পারমিট Print করে আবার ইমিগ্রেশান অফিশার ওখানে Signature করে আমাদের হাথে দিয়ে দিলেন। সমগ্র ব্যপার টা হল মাত্র ৪৫মিনিট এ।

এবার আসি মোবাইল সিম এর ব্যপারে। ১১ নম্বর কাউন্টার এ থেকে পারমিট নম্বর দিয়ে Bhutan Telecom (BT) Sim নিতে পারেন যা সবথেকে সস্তা।

Price- nu 110

Balance- nu100

Call charge to india- nu4/ minute

Recharge 49 for 450MB net

Recharge 99 for 850MB net.

বাইরে থেকে পাবেন তাশি সিম।

Price- nu 310

Balance- nu200

Call charge to india- nu4/ minute

Recharge 49 for 450MB net

Recharge 99 for 850MB net.

সমস্ত সিম আগে থেকেই Activated Tourist Sim valid for 1 month. আমরা ভুটান সময় ৩ টে তে থিম্পুর উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম আর শুরু হল সমগ্র পাহাড়ি পথে এক নতুন দেশ ভ্রমণ...।



পাহাড়ে কেমন যেন ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসে। হাতের ঘড়িটা ভারতের সময় দিচ্ছে, কিন্তু মোবাইল টা ইন্টারনেট এর স্পর্শে ভুটান এর সময় দিচ্ছে। আমরা চলেছি থিম্পুর উদ্দ্যেশে। সমতলে হলে ১৬৫কিমি রাস্তা হয়ত ৩ ঘণ্টা সময় লাগত, কিন্তু এত সর্পিল রাস্তা। শুধু ঘুরেই চলেছি আর ঘুরেই চলেছি। এখানকার যারা টুরিস্ট ড্রাইভার হন, তাঁদের ভুটান সরকারের কাছে একটা পরীক্ষা দিতে হয়। আর সেখানে অনেক নিয়ম আছে। যার মধ্যে একটা হল গাড়ি কখনই ৩০-৫০কিমি প্রতি ঘণ্টার বেশী চালাতে পারবে না। জানেন কি এখানে কোন ট্রাফিক নেই, নেই কোন ট্রাফিক সিগন্যাল। সবাই জেব্রা ক্রসিং দিয়েই রাস্তা পারাপার করেন আর সমস্ত গাড়ি এমনিতেই দাড়িয়ে যায়। বেশী দূর নয়, আপনি জাস্ট জয়গাও থেকে ফুটসিলিং এলেই বুঝতে পারবেন পরিবর্তন টা, আর বুঝতে পারবেন আমরা কতটা নোংরা।

গাড়ি পাহাড়ি পথে ফুটসিলিং কে নীচে ফেলে উঠে এল। ভুটান এর ঘড়িতে ৩টে হলেও সূর্যের তেজ বেশী নেই। গাড়ির জানালা আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তায় পেলাম একটা ছোট্ট জনপদ গেদু। বেশ সাজানো গোছানো। এর আগে আমাদের গাড়ি চেক পোস্ট এ আমাদের পারমিট দেখিয়ে নিয়েছে। ভয় নেই এখানে গাড়ি চেকিং করে না, কারণ এরা বিশ্বাস করতে জানে। জানালা টা একবার খুলেছিলাম, তখন সূর্যি মামা সামনের পাহাড়ের গায়ে সোনালী আভা ছড়াচ্ছে। ঠান্ডা শীতল হাওয়া তীরের মত বিধল। গাড়ির আলো জ্বলে গেছে। আলো আধারি ভাব। বড় একটা জনপদ এল। চুক্কা, বেশ নামগুলো। চুক্কা পেড়িয়ে গাড়ি যখন উলটো দিকের পাহাড়ে এল, চুক্কা কে আধারের মধ্যে হাজার জোনাকির মত জ্বলতে দেখলাম। আহা মন ভরে গেল। এর পর আমরা শুধু রাস্তা দেকেছি গাড়ির হেড লাইটে। বাম দিকে পারোর রাস্তা, আমরা সোজা এগিয়ে চললাম থিম্পুর দিকে। দেখলাম ভুটান রাজার দরবারে প্রবেশ এর মত, একটি গেট আমাদের স্বাগত জানল থিম্পু তে।আমারা কিছু এগিয়ে আর শহরে গেলাম না, একটা রাস্তা একটা পাহাড় বেয়ে একেবারে উপরে উঠে গেছে। রাস্তার শেষে পেলাম একটি ঘর, একেবারে পাহাড়ের শেষ প্রান্তে। নিচে ঝকঝক করছে থিম্পু শহর। অসাধারণ, এ যেন স্বর্গ রাজ্য, এত ভাল হোটেল পাব ভাবতেই পারিনি। না শহরের কোলাহল এখানে এসে পৌছাতেই পারবে না, এক অনাবিল নিস্তব্ধতা আমাদের স্বাগত জানাল।আজ খুব ক্লান্ত, অনেক বড় Journey ছিল। এবার হোটেল এ খেয়ে জাস্ট বিশ্রাম।

পরের দিন আমি এলারম দিয়ে রেখেছিলাম মোবাইল এ। আমার ঘর এর জানালা দিয়ে কালকের এ জোনাকির আলো ভরা পাহাড় টাকে দেকেছিলাম, সেখানে যখন সোনা রোদ্দুর এসে পড়বে, তার শোভা উপভোগ করব আর আপনাদের জন্য ভিডিও করে আনব বলে। সত্যি বলছি, খুব খুব কষ্ট হয়েছে ভোর বেলা লেপ কম্বল ছেড়ে বের হতে, কিন্তু আপনাদের জন্য ওই যে বললাম ভিডিও করব। কোন রকমে কম্বল ছেড়ে ঘরের মধ্যে থেকে ক্যমেরা ফিট করে আবার শুয়ে পড়লাম। ড্রাইভার বলেছে সকাল ৯টায় বের হবে সাইট সিন এ যাবে। ৭টায় উঠে পড়লাম আর প্রাতঃ কাজ এর সাথে গিজারের জলে স্নান সেরে নিলাম। এখানে একটু বলে রাখি, ভুটান এ খাওয়া একটু দামী, আমি আপনাদের জন্য কিছু মেনু কার্ডের ফোটো এনেছি, সেগুলো পরে দেব। আমরা আগে থেকেই ড্রাই ফুড (মুরি, শসা, চানাচুর, বিস্কুট, বাদাম ইত্যাদি) এনেছিলাম প্রাতঃরাশ আর সন্ধ্যার উদর পুরনের জন্য। সকালে প্রাতঃরাশ টা বেশ ভালোই হল, আমরা সবাই রেডি হয়ে বের হতে যাচ্ছি, কিন্তু ঘরের বাইরে এসে বুঝলাম, কতটা ঠাণ্ডা বাইরে। মেঘ মুক্ত আকাশ, তাই বরফ নেই, নেই কি আছে তো... একটা গাছে জল দেওয়া হচ্ছিল আর গাছটা পুরোপুরি বরফ হয়ে জমে আছে। রোদ্দুর এসে এক অসাধারণ শোভা বিস্তার করেছে। সবুজ হলুদ এ মেশামেশি ভুটানের পরিবেশ। হেমন্ত যে, পাতা ঝরার এই তো সময়। আর সামনের সেই জোনাকি পাহাড়টা, যেটা রাতে শোভা বাড়িয়েছিল, দিনের শোভা, কি ভাবে যে বর্ণনা করব। অনেক কাগজ টুকরো কেউ সাজিয়ে রেখেছে সামনের পাহাড়ের গায়। দূরে দেখা যাচ্ছে বুদ্ধ পয়েন্ট এর সিটিং বুদ্ধ। যাব ওখানে, নিশ্চই যাব। ড্রাইভার বললেন, আগে আমরা পুনাখা আর হা এর পারমিট করাব, আর তার পরেই থিম্পু ঘোরা। চারিদিকে ঝকঝক করছে। প্রকিতি এখানকার পরিবেশ কে এখানকার মানুষ জনের মতই সুন্দর বানিয়েছে। এত আতিথেয়তা সত্যি বলছি আমি আমার দেশের কোথাও বেড়িয়ে পাইনি।


হোটেল থেকে থিম্পু শহর

আমাদের গাড়ি হোটেল পাহাড় থেকে নেমে থিম্পু শহরে প্রবেশ করল। ঝা চকচকে শহর, মনে হচ্ছে ছবির মত কোন ইউরোপ বা আমেরিকার শহরে আমরা। কোথাও কোনো আবর্জনা নেই, সবার মধ্যে কতই না শিঙ্খলা। না আছে কোনো ট্রাফিক জাম, না কোনো দূষণ এর থাবা। আমাদের গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল থিম্পু ইমিগ্রেশান অফিস এর সামনে। এখানে পুনাখা আর হা এর পারমিট করা হয়। ১০০টাকা লাগে, আর পারমিটের ফোটোকপি করতে হয়। মনে হয় ফোটো কপি করতেই টাকাটা লাগে। আমাদের ড্রাইভার ফর্ম নিয়ে জমা দিয়ে চলে এলেন। কিছু পরে আবার আসতে হবে পারমিট সংগ্রহ করতে। এখানে একটা গল্প বলি। আমাদের সাথে এক বেঙ্গল এর গাড়িও পারমিট করতে গেল। তার ড্রাইভার (বাঙ্গালী) গাড়িতে বললেন ৫০০টাকা লাগবে। অথচ এত লাগেই না। আমাদের ড্রাইভার অবশ্য সেই গাড়ির নামে Complain করে এসেছে, আর আমাদের কাছে আক্ষেপ করেছেন যে এরাই আমাদের দেশের নাম দুর্নাম করছে এত বেশী টাকা নিয়ে।

এর পর এলাম Thimpu Folk Haritage Museum এ...

আঁকা বাকা পাহাড়ি পথে শহরের মধ্যে দিয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে, ঝা চকচকে রাস্তা ঘাট বার বার লজ্জা দিচ্ছে আমাদের নিজের দেশের পরিবেশ এর কথা ভাবতে। চড়াই উতরাই পেড়িয়ে আমাদের গাড়ি দাঁড়াল একটা ছোট্ট পারকিং এ। সামনেই মুখ্য দুয়ারে লেখা আছে FOLK HARITAGE MUSIUM, THIMPU. নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এখানে ভুটানের আরও কিছু পরম্পরা সামনে আসতে চলেছে। সোজা রাস্তা চলে গিয়েছে। বাঁ হাতে অনেক গুলো সারি বদ্ধ ঘর, দরজা বন্ধ। কিছু এগিয়ে, একটি দরজা খোলা, টিকিট কাউন্টার। ৫০ টাকা জনপ্রতি টিকিট কেটে এগিয়ে গেলাম। ঘাসের গালিচা পাতা মাঠের মধ্যে কয়েকটা দরজা আর জানালা একা দাড়িয়ে আছে। ফোটো তোলার এর থেকে ভাল স্থান হয়না। সেই জন্য তো রাখা হয়েছে। আরও একটু এগিয়ে গিয়ে ডানহাতে একটা ঘর এর মধ্যে কিছু আছে, বাইরে লেখা আছে GRINDING WATER MILL, জলের প্রবাহ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে Grinding করার যন্ত্র। নাম টা শুনেই বুঝতে পারছিলাম আমরা এখানে ভুটান এর পরম্পরা কে স্পর্শ করতে পারব হয়ত। মিউজিয়াম এর ভিতরে ছবি তোলা নিষেধ তাই ফোটো আপনাদের জন্য আনতে পারলাম না।


ফল্ক হেরিটেজ মিউজিয়াম

আর ৫টা বড় শহরে মিউজিয়াম বলতে যা বুঝি এটা তার ধারে কাছে না। ঝা চকচকে ফ্লোর নেই, আছে ভুটানের মাটির টান। তিন তলা এই মিউজিয়াম টি মাটির বানানো বলেই মনে হয়, হয়ত বা চুন সুরকি দিয়ে গাথা। ফ্লোর গুলি কাঠের। চারিদিকে ভুটানের চলে যাওয়া জীবন শৈলী কে সাজিয়ে রাখা আছে সযত্নে। হয়ত এই ইতিহাস বেশী পুরোনো নয়। সদ্য পেড়িয়ে আসা এক যুগের সামনে আমরা। একটা উনানে আগুল জ্বলছে আর একটা পাত্রে কিছু তৈরি হচ্ছে। এক মহিলা (এখানে যেহেতু মহিলাঃ পুরুষ = ৩:১, তাই সবত্র মহিলারাই সব করছে, একটা Perfect মাতৃত্রান্তিক দেশ) আমাদের কে জিজ্ঞাসা করল এক গ্লাস দেব? এখানে Natural Pure Wine তৈরি করছে একেবারে Natural Process ব্যবহার করে। আপনি টেস্ট করতে পারেন, আবার কিনেও নিয়ে যেতে পারেন। এটাও ভুটান এর ইতিহাস কে সামনে তুলে রাখার জন্য। এখানে আছে মাটির বিভিন্ন পাত্র, তামার পাত্র, পশুর চামড়ার ব্যাগ, সুরা পাত্র, কাঠের পাত্র, চামচ, উলু ঘাস, সাবাই ঘাস দিয়ে তৈরি মাদুর, আসন, শিকার করার অস্ত্র ইত্যাদি। আদীম মানুষ যে সমস্ত জিনিস ব্যবহার করত তার দৈনন্দিন জীবন যাপন এর জন্য, সমস্ত কিছুই এখানে Showcase করা আছে। বেশ ভাল লাগবে এগুলো দেখতে দেখতে আর ফিরে যেতে, ইতিহাস বইয়ের পাতায় দেখা জিনিস গুলোর সামনে।

বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে বেড়িয়ে এলাম গাড়ির কাছে। ঝকঝকে রোদ্দুর ঠাণ্ডা টাকে একটু আরাম প্রদান করছে। “ঠিক রাস্তার উল্টো দিকে চলে যান” বললেন আমাদের গাড়ির ড্রাইভার। লেখা আছে- NATIONAL INSTITUTE OF ZORIG CHUSUM. প্রবেশ করলাম। একটা জিনিস খুব লক্ষনীয়, এখান কার সমস্ত বাড়ি তে একটা উৎকৃষ্ট শিল্পকলার ছাপ। অসাধারণ কারুকার্য থেকে রঙের নিপুণতা, এমনকি দেওয়ালে আঁকা ছবি গুলোও এখানকার শীল্পের মান প্রকাশ করে বইকি। যার একটা নিদর্শন অবশ্যই এই ইন্সটিটিউট। এখানে প্রচুর ছাত্র ছাত্রী বিভিন্ন শিল্পকলার শিক্ষা প্রার্থী। দেখেও নেওয়া যায় এই ইন্সটিটিউট এ প্রবেশ করে। প্রবেশ মুল্য ১০০ টাকা জনপ্রতি। ইন্সটিটিউট এর মাঠে প্রবেশ করলেই বুঝতে পারবেন অসংখ্য ছাত্র ছাত্রী এখানে Outdoor এও বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত আর বেশীর ভাগটাই Practical. দেওয়াল এ আঁকা থেকে সিমেন্টের কাজ, মূর্তি বানানো, পোশাক তৈরি, পাথরের কাজ কি নেই এদের শিল্প কর্মের মধ্যে। আরও কিছুটা সময় কেটে গেল এদের কর্ম কান্ড দেখতে দেখেতে। আবার ফিরে এলাম গাড়ির কাছে। গাড়ি আমাদের নিয়ে চলল।

বাম দিকে হাত দেখিয়ে বলল, ওটা আমাদের Supreme Court. ওটা থিম্পু DZONG ও বটে। চারিদিকে পাহাড় ঘেরা মনোরম পরিবেশ আপনার চোখ সরাতে দেবেনা। এখানেই আছে রাজার বাড়িও। গাড়ি এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল, ড্রাইভার আমাকে ডেকে নিয়ে চলল সেই ইমিগ্রেশান অফিস এ। সেখানে একটা ঝুড়িতে অনেক পুনাখা আর হা এর পারমিট রাখা আছে, আমি খুজে নিলাম আমাদের টা। ফিরে এলাম গাড়িতে আর চললাম পরবর্তী গন্তব্যে।



এবার এলাম আমরা একটা Monastery তে। Monastery হল বৌদ্ধ উপাসনা স্থান। যেমন আমাদের মন্দির মসজিদ। শহরের প্রাণকেন্দ্রে ছোট্ট টিলার মাথায় এই Monastery অসাধারণ। সমগ্র থিম্পু শহর টাকে অসাধারণ ভিউ পয়েন্টে দেখতে পাবেন এখান থেকে। Monastery এর মধ্যে ফোটো তোলা নিষিদ্ধ, তবে বাইরের পরিবেশ আপনার মনকে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। Monastery এর নামটা জেনে নিলাম – “চাং গাং খা”। বেশ নামটা, আবার গাড়ি আমাদের নিয়ে ছুটে চলল।

পরবর্তী গন্তব্য টা এখন থিম্পুর মনে হয় সবথেকে বড় আকর্ষণ। বুদ্ধ পয়েণ্ট বা বুদ্ধ ডোডরমা। পৃথিবীর সব থেকে বড় সিটিং বুদ্ধ এটি। না তকমাটা এখনও পাওয়া হয়নি কারণ এই নির্মাণ কাজ এখনো চলছে। তবে আমাদের জন্য একটা সুখবর, আপনাদের এটা যেতে এখনো পর্যন্ত কোনো রকম টিকিট লাগবে না। এটি থিম্পুর এমন এক জায়গায় পাহাড়ের মাথায় অবস্তিত, যে সমগ্র শহর থেকে চোখ মেললেই আপনার চোখে পড়বে এই ধাতব বৃহৎ বুদ্ধ মূর্তি। তবে একটা ইনফরমেশান বলে রাখি, এই মূর্তির কপালে যে টিপ টি আছে সেটা সোনার এবং মাঝে আছে বিরাট সাইজের একটা হিরে। বুদ্ধের চারিদিকে ঘিরে আছে তারা (ভুটানের একটি দেবতা)। গর্ভ গৃহে আছে অসংখ্য ছোটো ছোটো বুদ্ধ মূর্তি যা চোখ ধাঁদিয়ে দেবে। সবথেকে ভাল লাগবে এর লোকেশান। চওড়া সিঁড়ি দিয়ে সামান্য উঠে বিস্তীর্ণ সমতল একটা ঝকঝকে বাঁধানো অংশের ঠিক শেষে বুদ্ধ দেব ধ্যন মগ্ন। একটা আধ্যাত্মিক অনুভূতি আপনার মনকে আচ্ছন্ন করতে বাধ্য। নীচে সমগ্র থিম্পু শহর মাথা নত করে আছে এই দেবতার পায়ে। আর অদুরে যে শৈলশ্রেনী ঘিরে আছে এই থিম্পু কে তার রূপ বর্ণনা নাই বা করলাম। কিছুটা আপনাদের চক্ষু যুগল এর জন্য রেখে দেওয়াই শ্রেয়। অনেকটা সময় কেটে গেল এই স্থানে। ওই যে আপনাদের জন্য ভিডিও তো করতে হল (লিঙ্ক পরে বলে দেব)।


বুদ্ধা পয়েন্ট, থিম্পু

বুদ্ধ পয়েন্ট দেখে আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম। গাড়ি পাহাড় এর পাকদন্ডি বেয়ে নামতে থাকল। এক জায়গায় এসে দাঁড়াল আমাদের ড্রাইভার সাহেব আর বললেন গাড়ির ডানদিক টা একবার দেখতে। মুহূর্তে আপনার সামনে আরও এক মন মাতানো দৃশ্য এসে হাজির। থিম্পু কে আরো কাছে থেকে দেখে নাওয়া আর কি। বুদ্ধ পয়েন্ট থেকে নিচের ঘর গুলো একটু ছোট লাগছিল। এ স্থান থেকে সেগুলো বড় লাগছে, তবে আরও অপূর্ব। গাড়ি আরও এগিয়ে যেতে থাকল।

আমি কিন্তু প্রথমেই ভুটান ভ্রমণ নিয়ে কিভাবে কম খরচে পুরোটা উপভোগ করবেন সেটাই বলছি। কম খরচ অথচ কিছু যেন বাদ না যায় সেটাও দেখতে হবে। কিন্তু কিছু জিনিস বাদ দিলেও আপনার তেমন কিছু বাদ যাবে না যদি আমাদের মত ড্রাইভার পান। আগেই বলেছি পুনাখা DZONG দেখলেই আপনি অন্য সমস্ত DZONG এর স্বাদ একসাথে পাবেন, তাই ৩০০ টাকা টিকিট কেটে সব DZONG না দেখলেও চলে। সেই রকম আর একটা স্থান MEMORIAL CHORTEN. এই বৌদ্ধ স্তুপা টি বেশ বড়, সবথেকে অভিজাত এবং ভুটান এর প্রধান CHORTEN বলতে পারেন। সামনের সবুজ ঘাসের গালিচা আর দুধ সাদা সৌধ টি এক কথায় অনবদ্য। কিন্তু এটার প্রবেশ মুল্য ৩০০টাকা। আপনি যদি বৌদ্ধ ধর্মবলম্বি হয়ে থাকেন তবে অবশ্যই টিকিট কেটে এটা প্রদক্ষিণ করে আসবেন, নাহলে আমাদের মত চলে আসুন অসাধারণ ভিউ পয়েন্ট এ। ফোটো তুলে নিন আর স্মিতিতে ধরে রাখুন।


মেমোরিয়াল চোরটেন

সকাল ৯টায় হোটেল থেকে বেরিয়েছি, আর এখন ২টো বাজে। খিদে টা প্রচণ্ড পেয়েছে, আর এই সময় উত্তম খাবারের সন্ধানে আমরা ড্রাইভার এর স্মরণাপন্ন। ডাইভার আমাদের নিয়ে গেল ঠিক CLOCK TOWER SQUARE এর উপরে একটা অসাধারণ রেস্টুরেন্ট এ। নাম- FOOTBALL , নামে কি এসে যায়, খুব ভাল INDIAN , CHINESE খাবার পাবেন, আমরা অন্তত ভুটানের বুকে এটা আশা করিনি। মেনু চার্ট আপনাদের জন্য দিয়ে দেব।






উদরপুরন করে আমরা এলাম CLOCK TOWER SQUARE এ। একেবারেই ঘিঞ্জি নয়, কারণ এটা OFF SEASON. কিছু ফোটো তুলে নিলাম। তবে প্রত্যেক পর্বের মত কিছু INFO এখানেও দিয়ে রাখি। ভুটানে ধুমপান একেবারেই নিসিদ্ধ তবে, এখানে মদ্যপান করা যায়। খুব সস্তায় এখানে NATURAL PURE WINE পাবেন, এবং এখানে খোলা বাজারে বিক্রি হয়। তবে সবাইকে একটাই অনুরোধ, ভুটান কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ট থেকে অনেক উচুতে, তাই দয়া করে মদ্যপান করবেন না, শরীর এর ক্ষতি হতে পারে।

CLOCK TOWER SQUARE থেকে একটু এগিয়ে গেলাম গাড়িতে। বাস স্ট্যন্ড এর কাছেই নদীর ধার ধরে আছে একটা CHILDREN PARK. প্রবেশ মুল্য নেই, তাই অবাধেই ঘুরতে পারেন এ স্থান। আগেই বলেছি হেমন্তের পাতা ঝরার সময় এখন। কিন্তু পাতার রং যখন লাল আর হলুদ এর মাখামাখি, সে পরিবেশ বোধ হয় আরও বেশী ROMANTIC. এই পথ যদি না শেষ হয়। খরস্রোতা থিম্পু চু নদী কল কল শব্দে বয়ে চলেছে। আর তার ধার ধরেই বাঁধানো রাস্তায় হেটে যান প্রিয় মানুষটার হাত ধরে, বসেই সময় কাটাতে পারেন বাঁধানো চেয়ার গুলোয়। সঙ্গে বুদ্ধ মূর্তি আর শরীর চর্চার উপকরণ ও আছে। তবে চোখ তুললেই যেটা প্রথম চোখে পড়বে তা অবশ্যই বুদ্ধ পয়েন্ট এর সিটিং বুদ্ধ, সমগ্র ভুবন কে এক দৃষ্টে দেখে যাচ্ছেন তিনি। সূর্যের আভা সামনের পাহাড় টার মাথায় উঠে গেছে। ঝুপ করে আবার আঁধার নেমে আসবে হয়ত। দূরে মাঠের মধ্যে এক ঝাঁক তরুণ ছেলেরা তির ছোড়া খেলায় ব্যস্ত। চারিদিকে উৎসাহী দর্শক এর ভীর। আঁধার নেমে আসছে, ওরাও খেলে ছেড়ে বাড়ি যেতে ব্যস্ত। আমরাও ফিরে চললাম আমাদের হোটেল এর দিকে।


ক্লক টাওয়ার স্ক্যার,থিম্পু

রাতে চিকেন কসা আর গরম গরম ভাত খেয়ে জমে যাওয়া ঠান্ডার মধ্যে ঘুম টা বেশ ভালই হল। থিম্পুতে দেখতে দেখতে ২টো রাত কাটিয়ে ফেললাম। আজ আমাদের গন্তব্য পুনাখা। থিম্পু থেকে দূরত্ব ৭২ কিমি। ড্রাইভার এর কথা মত আমরা সকাল ৯টায় রেডি হয়ে টিফিন খেয়ে গাড়িতে উঠলাম। ছবির মত থিম্পু কে ছেড়ে যেতে মন না চায়, কিন্তু আবার আমাদের থিম্পু ফিরতে হবে। কারণ পুনাখা থেকে আমরা পারো যাওয়ার সময় এই থিম্পু দিয়ের যেতে হবে। ঝকঝকে আরও একটা সকালে থিম্পু কে বিদায় জানিয়ে আমাদের গাড়ি থিম্পু পুনাখা হাই ওয়ে ধরে এগিয়ে চলেছে। আবার আমাদের পথচলা চড়াই ভেঙ্গে। পথে আসে চেক পয়েন্ট, আর এখানে আমাদের যে স্পেশাল পারমিট বানানো হয়েছিল, সেটা দেখাতে হল। রাস্তায় পড়ছে অনেক আপেল বাগান। যদিও এখন আপেলের সময় নয়। অধিকাংশ গাছের পাতা একেবারেই নেই। এমনকি গাছটি যে জীবিত সেটাও আপনি বুঝতে পারবেন না। পাহাড়ি বাঁক দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। অনেক বিদেশী দেখলাম এ পথে সাইকেল নিয়ে ভ্রমণ করছে, ওরাও নাকি পুনাখা যাবে এবং প্রায় গাড়ির সমান গতিবেগ এই।

কিছুটা চলার পর দেখলাম রাস্তা টা অনেকটা চওড়া, আর অনেক গাড়ি এখানে পারকিং করা আছে। চোখটা ডান দিকে ঘোরাতেই দেখলাম এত দোচুলা পাস পৌঁছে গিয়েছি। ছাবিতে দেখা এ দৃশ্য তো খুব চেনা। গাড়ি থেকে ঝট প্ট নেমে এলাম, আর ঠিক তখনই ১০২০০ ফুটের উপরে এই পাস ঠান্ডার কামরে তার মাধুর্য ব্যক্ত করল। সামনেই দেখা যাচ্ছে হিমালয়ের বরফ আবৃত পর্বত শৃঙ্গ। সূর্যের আলোয় এক দুধসাদা রেখার সৃষ্টি করেছে ওই শৃঙ্গ শিরা, ঠিক যেমন দারজিলিং এ কাঞ্চনজঙ্ঘা। যদিও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা কিন্তু ঝকঝকে রোদ্দুর মন ভালো করা একটা উষ্ণতা প্রদান করছে। এবার আসি দোচুলা কে কিভাবে চিনলাম দূর থেকে দেখে। অবশ্যই ছবিতে দেখা বৌদ্ধ স্তুপা গুলি এই জায়গাকে একটা আলাদা স্থান দিয়েছে। ১০৮টী ছোট ছোট আর একটি বড় স্তুপা নিয়ে রাস্তার ঠিক মাঝে মন মাতানো একটা শিল্প কলা এ খানেই অবস্তিত। আমি যাকে শিল্প কলা বলছি সেটা অবশ্য ভুটানিদের কাছে অতি প্রবিত্র এক ধর্ম স্থান।

এই জায়গা টা নিয়ে একটা ছোট গল্প বলি। সবাই এই স্থান টিকে প্রদক্ষিণ করে, আমরা যেমন আমাদের দেবতাদের চারপাশে করি। এমনকি সমস্ত গাড়ি যারা এই স্থান থেকে অতিক্রম করছে (স্থানীয় গাড়ি ও) সেই গাড়ি গুলো একবার প্রদক্ষিণ করে তবেই যাচ্ছে। আমরাও স্তুপা গুলির এক ধাপ উপর দিয়ে ডান দিক থেকে বাম দিকে প্রদক্ষিণ করছিলাম। ঠিক সেই সময় এক স্থানীয় মানুষ আমাদের বাঁধা দিল আর বলল “ আপনারা কি মুসলিম ধর্মবলম্বি?” না তো, কেনো বলুন তো? “তাহলে বাম দিক দিয়ে প্রদক্ষিণ করুন”। একেবারেই একটা অজানা তথ্য ছিল। আমরাও আই করলাম এবং লক্ষ করলাম সমস্ত গাড়িও তাই করছে।



রাস্তার যেখানে গাড়ি পারকিং করা থাকে, তার উল্টো দিকে কিছুটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা ক্যফেটেরিয়া পাবেন। অসাধারণ চা খেয়ে এই ঠান্ডায় শরীর একটু গরম করে নিতে ভুলবেন না। আর আছে সুলভ শোউচালয়, এখানে অনেক জায়গায় পাবেন তবে এটাও ভুটানে একটু দামী, ১০টাকা করে।

আমাদের গাড়ি এবার উতরাই ভেঙ্গে নামতে শুরু করল। পাহাড়ের পাকদন্ডি বেয়ে অবিরাম নেমেই চলেছি আর নেমেই চলেছি। প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমরা চলেছি পুনাখা, আর পুনাখা ভুটানের একটা নিচু অংশ। এখানে অন্যান্য স্থানের থেকে আবহাওয়া অপেক্ষাকৃত গরম। তাই পুনাখা শীতকালীন রাজধানী ও বলতে পারেন। তেমন গরমের সময় এখানকার আবহাওয়া বেশ উষ্ণ। রাস্তায় গাড়ি একটু থমকে দাঁড়াল। আমাদের ড্রাইভার হাত বাড়িয়ে যে দিকে দেখালেন, তাকিয়ে দেখি একটা কমলা লেবু গাছে, কমলা লেবু ভরে আছে। ক্যমেরা বন্দি করে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম।

উপর থেকে খাদের মধ্যে যে নদী টাকে দেখতে পাচ্ছিলাম অনেক ক্ষণ, আমরা প্রায় তার সমতলে এসে পৌঁছালাম। নীল স্বচ্ছ জল, অতি নির্মল এক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। তবে পুনাখা একেবারেই ঘিঞ্জি শহর নয়। খুব একটা বাড়ি ঘর হোটেল এখানে দৃশ্য দূষণ করবে না। আমরা একটা হোটেল এ খেতে এলাম HOTEL LINGER. দুপুর ১২টা বেজে গিয়েছে, তাই আগে খেয়ে নেওয়া ভালো। এই হোটেলের খাবারের স্বাদ একেবারেই খারাপ এবং দাম খুব বেশী। না এবারে আর খেয়ে হল না। আমরা আমাদের বুক করে রাখা হোটেল এ চলে এলাম আমাদের লাগেজ রেখে দিতে। এই হটেল টা আমাদের মন কেড়ে নিল এক ঝলকেই। একটা বাচ্চা মেয়ে আমাদের স্বাগত জানাল। সামনের নদীতে একটা ছোট্ট পাহাড়ি ঝর্না এসে পড়ছে। হোটেল এর বর্ণনা পরে দেব, আমাদের পুনাখা DZONG দেখতে যেতে হবে। আমরা তরি ঘড়ি বেড়িয়ে এলাম আর গাড়িতে যাত্রা শুরু করলাম। ছোট ব্রিজ পেড়িয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে সামনে দর্শন দিল পো চু আর মো চু নদীর মিলনস্থল আর সেই সংযোগ স্থলেই মাথা উঁচু করে আছে THE GREAT PUNAKHA DZONG. ঘড়িতে এখন ১.৩০মিনিট আর এখানে এখন লাঞ্চ টাইম। পাশে একটা হাট বসেছে। একটু এগিয়ে গেলাম। সব্জি, লেবু আর অনেক লঙ্কা নজর কারলো। একজন মহিলা (সবই মহিলা এখানে) কিছু শীতের পোশাক বিক্রি করছে। আমরা উৎসাহিত হয়ে একটা শাল এর দাম জিজ্ঞাসা করলাম আর শুনে মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়। এক্টির দাম বলে ২২০০০/- আর একটি ৫৩০০০/-। আমাদের এখানে ফুটপাথে কেউ যদি এরকম দাম বলত, সে জনগণের ধোলাই খেত।


পুনাখা ভ্যলি

আমরা ২টোয় PUNAKHA DZONG এর গেটে ফিরে এসে টিকিট কাটলাম। ৩০০টাকা প্রতি জন হিসাবে। সঙ্গে গাইড ফ্রি। গাইড না নিলে আপনার বেরাতে আসাটাই বৃথা। গাইড আমাদের পো চু নদীর উপর ব্রিজ এ দাঁড়াতে বললেন। আমরা ওখান থেকেই অদ্ভুত সুন্দর PUNAKHA DZONG দেখতে থাকলাম.

গাইড আমাদের মধ্যে যোগ দিলেন মিনিট ৫ এর মধ্যেই। অনেকেই নিজস্ব গাইড বাইরে থেকে নিয়ে এসেছেন। তারা নিজেদের গাইড নিয়েই DZONG এ প্রবেশ করেছেন। গাইড এসে প্রথমে আমাদের পো চু নদীর উপরে ব্রীজ থেকে জলের দিকে তাকাতে বললেন। নীচে অসংখ্য মাছের রেখা জলের মধ্যে দেখা যাচ্ছিল। গাইড খাবার চাইলেন, আমাদের ব্যগ এ বাদাম ছিল সেটাই নিয়ে গাইড সেই মাছেদের উদ্দ্যেশ্য করে ছুড়ে দিলেন। এক ঝাঁক মাছ লাফিয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। এর পর আমারা গাইড এর পরামর্শ অনুজায়ি আমরা এগিয়ে গেলাম DZONG এর মুল ফটক এর দিকে। গাইড হাত বাড়ালেন DZONG উপরের অংশে আর দেখলাম বড় বড় মোচাক। এটাও দর্শনীয়।

এর পর আমরা এগিয়ে গেলাম বড় সিড়ির কাছে। প্রধান সিড়িকে ৩টি ভাগে ভাগ করা আছে। মাঝের অংশের রং বাকিগুলো থেকে একটু আলাদা স্বর্ণাভ। এই অংশ সাধারনের জন্য নয়, শুধুমাত্র রাজার জন্য। সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে সবার ব্যগ চেক করে এখানকার সিকিউরিটি আমাদের DZONG এ প্রবেশ এর অনুমুতি দিল। গাইড যা বললেন কিছুটা সংক্ষেপে এখানে বলব, তবে সত্যি বলছি, নামগুলো একেবারে ভুলে গিয়েছি।

DZONG কথার অর্থ হল দুর্গ। আমাদের দেশে যেমন রাজারা বিভিন্ন দুর্গ তৈরি করেছিলেন শ্ত্রুদের হাথ থেকে বাঁচার জন্য, ভুটান এও দুর্গ তৈরি করা হয়েছিল। সমগ্র ভুটান এ মোট ২০টি জেলা আছে আর প্রত্যেকটি জেলাতেই একটি করে DZONG আছে। ভুটানে আগে কোনো ধর্ম ছিল না। সবাই সবার মত থাকতো। সেই সময় Zhabdrung Ngawang Namgyal নামক ব্যক্তি তিব্বত থেকে আসেন ভুটান এ এবং এখানে বাস করতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে তিব্বত ভুটান আক্রমন করে এবং তিনি ভুটান কে বাচানোর জন্য একের পর এক গড়তে থাকেন দুর্গ। এটা মনে করা হয় সব DZONG তাঁর হাতে নির্মিত, তাই এর গঠনশৈলী ও একি। আর ভুটান কে একত্র করে গড়ে তোলার পিছনে তিনি ছিলেন। তাই তাঁকে ভুটানের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। আর বর্তমান রাজা হল তাঁর বংশধর। যদিও রাজতন্ত্র ভুটানে অনেক অনেক পরে এসেছে। এখন কার রাজা হলেন ভুটানের পঞ্চম রাজা।

সমস্ত DZONG গুলি এখন ভুটান সরকারের প্রশাসনিক ভবন। তাই প্রবেশ এর পরেই যে প্রশস্ত প্রাঙ্গণ আছে তাঁর দুই ধারে ঘরগুলি এখন প্রশাসনিক অফিস। প্রত্যেকটি DZONG এর ঠিক মাঝে আছে উঁচু একটা ভবন। এটিকে ওয়াচ টাওয়ার বলা যেতে পারে। শ্ত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করাই ছিল এর কাজ। তবে বর্তমানে এখানে বুদ্ধিস্ট লামারা থাকেন। DZONG এর মধ্যে প্রশস্ত প্রাঙ্গণে আরও একটি স্থান লক্ষনীয়, রাজার বসার জায়গা। এথানে সভা চলাকালীন বা জনগণের সঙ্গে আলোচনাকালীন রাজা ও অন্যান্য সভাসদ দের বসার আলাদা স্থান ছিল যা একতলার উপরে ডানদিকে। ওয়াচ টাওয়ার পেরিয়ে আরও একটা ছোট প্রাঙ্গণ, বর্তমানে এগুলি এখন ধর্ম উপাসনা কেন্দ্র বলা চলে। আরও এক সরু গলি পেরিয়ে আমরা এলাম মুল মনেস্ট্রির সামনে। প্রত্যেকটা DZONG এ একটি করে মনেস্ট্রিও পাবেন। তবে এই মনেস্ট্রির গুরুত্ব অনেক বেশী। এটি হল ভুটানের প্রথম এবং প্রধান DZONG। এখানকার সরকার কে দু ভাগে ভাগ করা যায়। এক সরকার জনগণের, যার প্রধান হলেন রাজা।আর এক সরকার ধর্মে্‌ যার প্রধান হলেন ধর্মীয় গুরু। জনগণ, রাজার আইনে চলবে আর সমস্ত সাধু/ লামারা, ধর্মীয় প্রধানের আইনে চলবে। দুজনে দুজনের কোনো পদক্ষেপে বাঁধা দিতে পারে না। রাজা / সরকারের রাজধানী যদিও থিম্পু কিন্তু ভুটানের ধর্মীয় রাজধানী অবশ্যই পুনাখা।



(আমরা মনেস্ট্রির মধ্যে প্রবেশ করলাম। এখানে বলে রাখি, অনেক মূর্তি এখানে রাখা আছে, এখানে ফোটো তোলা একেবারেই মানা, তাই সব কিছু মনে করে বলতে পারলাম না, যতটা পারি চেষ্টা করছি)

উপাসনা গৃহের সবথেকে সামনে ডানদিকে একটি সিংহাসন এ আছে বর্তমান রাজার ফোটো আর বামদিকে বর্তমান ধর্মীয় গুরুর ফোটো। সবথেকে বড় যে মূর্তি (কয়েক শ টন ওজনের পঞ্চধাতুর) মাঝখানে বিরাজমান তা হল গৌতম বুদ্ধের। তাঁর ডানদিকে আছে প্রধান বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক ও বাহক গুরু পদ্মসম্ভবা, যার জন্ম পদ্ম থেকে। আর বামদিকে আছে ভুটানের প্রতিষ্ঠাটার মূর্তি। এছারাও আছে ভুটানের যমরাজ, ভুটানের শিল্প/ বিদ্যার দেবতা (এখানে দেবী নয়) ও গুরু পদ্মসম্ভবার দুজন ফলোয়ার এর মূর্তি। (কিছু ভুলেও যেতে পারি, তাঁর জন্য ক্ষমা করবেন)।

এবার বলি এস্থানের অনেক গুরুত্ব এর মধ্যে এটা প্রধান হল, সমস্ত রাজাদের বিবাহ এই উপাসনা গৃহেই হয়ে থাকে। যেহেতু ভুটান একটাই দেশ একটাই রাজ পরিবার এই মন্ত্রে বিশ্বাসী তাই সমস্ত রানী কোন রাজ পরিবারের হয় না। রাজার বড় ছেলেই এখানে রাজা হতে পারে এবং এ নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই। বাকিরা Department wise President হয়ে থাকেন। প্রত্যেক President এর নীচে থাকেন Elected MP। এক অদ্ভুত রাজতন্ত্র আর প্রজাতন্ত্রের মেল বন্ধন ঘটেছে এখানে। এখানে কোনো হিংসা নেই, কোনো Crime নেই। খুব সামান্য পুলিস এখানে। কোনো ট্রাফিক নেই, এমনকি এখানকার রাস্তার কুকুরও Zebra Crossing ব্যবহার করে থাকে। এখানকার রাজা কোনো সিকিউরিটি ছাড়াই ঘুরে বেড়ান। এবং এরা অবাক হয়েছে যখন একটা সামান্য INDIAN FLIMSTAR আমির খান, সিনেমার সুটিং এ ৪ জন দেহ রক্ষী নিয়ে গিয়েছিলেন তা দেখে।

বর্তমান রাজার বয়স ৩৮ আর রানি ৩০। রাজা প্রেম করে বিয়ে করেন। রাজা স্কুলের এক জুনিয়ার মেয়েকেই ভালোবেসে ফেলেন যখন তিনি ১৫ আর রানী ৭ বছরের। এখন রাজার একটি পুত্র সন্তান আছে ২ বছরের যে পরবর্তী রাজা হবে। ভুটানে যেহেতু মহিলা : পুরুষের = ৩ : ১, তাই যে কেউ এখানে ৪টে পর্যন্ত বিয়ে করতে পারে। মেয়েরাই মুলত এখানে রোজগেরে। এখানে যা যতটুকু আছে তাতেই সে খুসি তাই ভুটান Happiest country of the World.”

এছাড়াও বহু গল্প ছিল পুনাখার গাইড এর ঝুলিতে যা সমস্ত হয়ত বলতে পারলাম না, আর কিছুটা আপনাদের জন্য বাঁচিয়ে রাখলাম।

২ ঘণ্টা অনায়াসেই কেটে যাবে এখানে আর আপনি সমৃদ্ধ হয়ে উঠবেন ভুটানের ইতিহাসে। আমরা ফোটো তুলতে তুলতে ঝুপ করে সূর্যের তেজ কমে এল। ধীরে ধীরে বেড়িয়ে এলাম DZONG থেকে। গাড়িতে উঠে এলাম পোচু আর মোচু নদীর সংযোগস্থলে। এখান থেকে অসাধারণ লাগে DZONG টিকে। সময় থাকলে ঘুরে আসতে পারেন মোচু নদীর উপরে অবস্তিত সাসপেন্সান ব্রিজ থেকে (ঝুলন্ত সেতু)।

এবার ফিরে আসতে থাকলাম আমাদের হোটেল এর দিকে। কোলাহল মুক্ত একটা অসাধারণ জায়গায় আমাদের হোটেল টি। পাশেই নদী বয়ে গেছে আর নদীর উপর নেমে আসছে একটা ছোট্ট পাহাড়ি ঝর্না। একটা বাচ্চা মেয়ে আমাদের যে স্বাগত জানিয়েছিল, আমাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে আমাদের সদস্য হয়ে উঠল। তাঁকে নিয়ে সন্ধ্যাটা কেটে গেল কিভাবে বুঝতেই পারিনি। খাবার অর্ডার এসেই দিয়ে দিয়েছিলাম। রাতের খাবার শেষে আশ্রয় নিলাম নরম বিছানায় কম্বলের নীচে।


হোটেলের রুম থেকে

সকালে ঘুম থেকে উঠে যেটা করলাম সেটা হল জানালার পর্দা টাকে সরিয়ে দেওয়া। মাথার ধারেই কুলু কুলু শব্দে যে জল ধারা নদীর উপর নেমে আসছিল, সকালের রোদ্দুর এ তাকে কেমন লাগছে সেটা দেখার উৎসাহ চেপে রাখা গেল না। আজ ও ৯টায় গাড়ি ছাড়বে আর আমরা যাব পারো। আমাদের এই টুরের শেষ গন্তব্য কিন্তু এখন আমরা আমাদের টুরের মধ্যভাগে আছি। এখনও অনেক কিছুই দেখা বাকি।

ঠিক ৯ টায় আমরা সবাই রেডি হয়ে চলে এলাম গাড়িতে। আজও ঝকঝকে আবহাওয়া, রোদ ঝলমলে পরিবেশ, বেশ ভাল লাগছে ঠান্ডার মধ্যে। গাড়ি আমাদের নিয়ে ছুটে চলল আবার ফিরতি পথে। নীচে পুনাখা উপত্যকা কে ছবির মত সুন্দর লাগছে। নদী কেন্দ্রিক উপত্যকা তাই এখানে চাষ বাস বেশী হয়। তাই পাহাড়ে ধাপ কেটে কেটে বানানো চাষের জমি এ জায়গার রূপ কে অন্য মাত্রা দিয়েছে। আমরা দোচুলা পাশ পেরিয়ে অনেকটা পথ নীচে নেমেছিলাম। আজ তাই আমাদের পথ পুরোটাই চড়াই ভেঙে। ড্রাইভার নিপুণ দক্ষতায় আমাদের নিয়ে এগিয়ে চলেছে। দেখতে দেখতে আমরা এসে গেলাম আবার দোচুলা পাস। আগেই বলেছি, প্রথা অনুযায়ী আমাদের গাড়িও বৌদ্ধ স্তুপ গুলোকে প্রদক্ষিণ করে নিল বাম দিক থেকে ডান দিকে আর ফিরে চললাম চেনা পরিচিত রাস্তা ধরে থিম্পুর দিকে। পুনাখা থেকে পারো যেতে হলে থিম্পুর উপর দিয়েই যেতে হয়। প্রসঙ্গত ফুটসিলিং থেকে থিম্পু আসার সময় আপনি পাবেন পারো যাওয়ার পথ। সেই পথেই আমাদের পারো যেতে হবে।

দূরে দেখতে পেলাম বুদ্ধা পয়েন্ট এর বিশাল সিটিং বুদ্ধ, আমরা বুঝলাম থিম্পু এসে গেছে। থিম্পু ছেড়ে আমরা ফুটসিলিং এর দিকে এগিয়ে যেতে থাকলাম। এখানে আসার সময় আমরা রাতে এসেছি, তাই এ পথ টাও নতুন লাগছে। বেশ অনেকটা আসার পর, নদী পেরিয়ে আমরা পারো চু নদীর ধার ধরে এগিয়ে যেতে থাকলাম। এখানে আসার পর ধীরে ধীরে দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে থাকল। পারো চু নদীর উপত্যকা একটু ধস প্রবন। এখানে কিছুটা শুখনো পাহাড় নজরে এল। কিন্তু সব কিছু এক নিমেষে বদলে গেল যখন আমাদের ড্রাইভার একটা জায়গায় আমাদের নেমে গিয়ে দেখে আসতে বললেন। আমরা এসে গেছি পারো চু নদীর একদম সমতলে। আপন বেগে বয়ে চলেছে নদী। ইতি উতি ছড়িয়ে নুরি পাথর। কাচের মত স্বচ্ছ জল আর হিম শীতল তাপমাত্রা সে জলের। ছবি তোলার আদর্শ জায়গা এই নদীর উপত্যকা। তবে আরও একটা অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস এর ব্যবস্তা আছে। একটু ম্যনুয়াল রোপ ওয়ে, ঝুলে পড়ুন আর ঘুরে আসুন নদীর অপার থেকে। হঠাত মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল ড্রুক এয়ার এর বিমান, আর আমরা বুঝতে পারলাম, আমরা পারোর খুব কাছেই এসে গিয়েছি।


চু নদী, পারো, ভূটান

এর পরের পথ টা বেশ সমতল এবং জনবসতি পূর্ণ। নদীর ধার ধরেই রাস্তা এগিয়েছে। গাছের পাতা হলুদ বর্ণ ধরেছে, ঠিক যেন চিনার গাছ দিয়ে সাজানো রাস্তা, ঝকঝকে শহরে প্রবেশ করলাম। ডান হাতে বিরাট লম্বা বিমান রান ওয়ে ধরে গাড়ি ছুটে চলছে। পারো DZONG ও পেরিয়ে এলাম। খুব খিদে পেয়েছে। ঘড়ি বলছে ১টা ৩০ মিনিট। আমরা পরিষ্কার ঝকঝকে শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটা রেস্তোরাতে প্রবেশ করলাম। খুব ভালো খাবার আর রেস্তোরার ভিতর রুম হিটার বেশ আরামদায়ক। আপনাদের জন্য মেনু কার্ড দিলা ফোটো তে (Night Theme Restrurent, Paro).





খাওয়া দাওয়া পর্ব মেটানোর পর আমরা গাড়িতে আবার যাত্রা শুরু করলাম। এবার যাব পারো মিউজিয়াম। প্রসঙ্গত আমাদের হোটেল টি পারো শহর থেকে একটু বাইরে, টাইগার নেস্ট যাওয়ার পথে, তাই আমরা মিউজিয়াম দেখে তাঁর পর হোটেল এ যাব।

পাহাড়ের পাকদন্ডি বেয়ে আবার উপরে উঠছি। পারো মিউজিয়াম টি, পারো শহরের ঠিক মাথায়। অপরূপ ভিউ পয়েন্ট ও বটে। এখানে ২৫টাকা প্রবেশ মুল্য দিয়ে আমরা আগে মিউজিয়াম টি দেখে নিলাম। খুব সাজানো গোছানো একটা মিউজিয়াম। ভিডিও কনফারেন্স এর ব্যবস্থা আছে, আপনি এখানকার ট্রাডিশানাল মুখোশ এর একটা দারুন সম্ভার পাবেন। এর পরের ঘরটি ভারতীয় দের জন্য, কারণ এখানে সমস্ত প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ভুটান সফরের ফোটো আছে। আর সবথেকে শেষে যে বড় রুম টি পাবেন সেখানে পাবেন ভুটানের পশু, পাখি, গাছপালা আর পাহাড়ের অপূর্ব বিবরণ ও রেপ্লিকা। দারুন লাগবে এই স্থান। মিউজিয়াম ঘুরে বাইরে বেড়িয়ে এসে পারোর দৃশ্য আর এক উপরি পাওনা। পারো চু নদী ধরে সাজানো আছে ছবির মত একটা শহর। মন ভরে যাবে এখান থেকে পাহাড়ের পিছোনে সূর্য কে লুকাতে দেখে। এবার হোটেল এর দিকে যাওয়া যাক...।।


পারো মিউজিয়াম

পারোর হোটেল এ যখন পৌছালাম, তখন চারিদিক মোটামুটি অন্ধকার হয়ে এসেছে। ঠাণ্ডা টা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। গাড়ির বাইরে এসে রীতিমত কাঁপতে থাকলাম সকলে। হোটেলের রিসেপ্সান এ ফায়ার ক্লে তে আগুন জ্বলছে। একেই বলে উষ্ণ অভ্যর্থনা। এক কাপ করে ওয়েলকাম টি অভ্যর্থনা টাকে অন্য মাত্রা দিল। নিজেদের ঘরে প্রবেশ করে বিশ্রাম নেওয়া শুরু কারণ কাল আমরা যাব টাইগারনেস্ট মনেস্ট্রি দেখতে। পায়ে হেটে যেতে সময় লাগবে ৪ ঘণ্টা আর ফিরতে প্রায় ৩ ঘণ্টা, সব মিলিয়ে ৭ ঘণ্টা হাটতে হবে। আমরা ঠিক করলাম সকাল ৭টায় বেড়িয়ে যাব। সঙ্গে আছে ড্রাই ফুড আর জলের বোতল।


পারো তখন হিমাঙ্কের নীচে

সকাল বেলা ঘুম ভাঙতেই জানালার পর্দা সরিয়ে আবার থিম্পুর মত দৃশ্য চোখে পড়ল। ঝকঝকে মেঘমুক্ত আবহাওয়া কিন্তু একটা গাছের গোরায় জলের পাইপ লাইন ফেটে যাওয়ায় গাছটাতে জল পড়ছে। আর সেই জল জমে বরফ হয়ে অসাধারণ একটা দৃশ্যপট তৈরি করেছে। ঝটপট তৈরি হয়ে গাড়িতে এলাম। হোটেলের বাইরে এসে বুঝতে পারলাম কেন জল বরফ হয়ে যাচ্ছে। হাত পা জমে যাচ্ছে, এত ঠাণ্ডা অথচ ওই একটা গাছ ছাড়া বাকি কোথাও বরফ নেই। গাড়ি যথারীতি ৭টায় আমাদের কে নিয়ে টাইগারনেস্ট টিকিট কাউন্টার এর দিকে এগিয়ে চলল। আমরা এমনিতেই পারো থেকে অনেক এগিয়েই আছি তাই আমরা ১০-১৫ মিনিটেই এসে পড়লাম ট্রেকিং শুরুর স্থানে। ৭টায় কাউন্টার খোলে, তাই আমরা অনায়াসেই টিকিট কেটে নিলাম। প্রসঙ্গত এখানে বলে রাখি, মনেস্ট্রির প্রবেশ মুল্য ৫০০ টাকা জনপ্রতি বিদেশী দের জন্য, আর আমরা ভুটানে কিন্তু বিদেশী। হেটে মনেস্ট্রি পর্যন্ত যাওয়ার জন্য কোনো টাকা লাগে না, শুধুমাত্র এটা মনেস্ট্রি প্রবেশমূল্য। আপনি যেতে পারবেন কিনা যদি সন্দেহ থাকে টিকিট নাও কাটতে পারেন, কিন্তু একবার পৌঁছে গেলে প্রবেশ করার জন্য আর টিকিট পাবেন না। আরও একটা জিনিস মাথায় রাখবেন এখানে হাঁটতে গেলে আপনাকে সাহায্য করবে লাঠি, যা ৫০টাকায় ভাড়া নিতে পারেন এখান থেকেই। ঘোরা আছে আপনাকে অর্ধেক রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য, বাকি অর্ধেক আপনাকে হেটেই যেতে হবে যা আরও বেশী কঠিন, তাই ঘোরা Avoid করার চেষ্টা করুন।


যাত্রা শুরু, টাইগার নেস্ট, পারো

মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা, তাও ঠাণ্ডা কোথায় থেকে ঢুকছে বুঝতে পারছি না। হাত জমে যাচ্ছে, লাঠি টাও ভালো করে ধরতে পারছি না। এই রকম অবস্তায় হাঁটা শুরু করলাম। উপরের দিকে চোখ তুলেই দেখতে পেলাম সামনের পাহাড়ের উপরে একটা খাজে আটকে আছে টাইগার নেস্ট মনেস্ট্রি, তবে উপরের দিকে না তাকানোই ভাল, আপনি যদি ভাবতে বসেন অত উপরে কি করে যাব তাহলে অর্ধেক দম আপনার ওখানেই শেষ। সূর্যি মামার তেজ একদম নেই শুরুতে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আমরা চড়াই ভেঙে এগোচ্ছি। বলে ভাবছেন যাব কি যাবনা, তাঁদের কে বলি আমার সঙ্গে ছিলেন আমার ষাটোর্ধ বাবা, পঞ্চাশ পেরনো মা, পয়ষট্টী পেরোনো মাসি, সব্বাই অনায়াসেই ঘুরে এসেছেন।

কিছুটা হাটার পর সূর্যের আলো গায়ে পড়ল। এবার হাত পা ঠিক কাজ করছে। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেওয়ার জায়গাও আছে। ঘোড়ার রাস্তা ছাড়াও মাঝে মাঝে পায়ে হাঁটা রাস্তা আছে, তবে সে রাস্তা আরও একটু খাড়াই। প্রায় ২ ঘণ্টা হাটার পর আমরা ঘোড়া যেখানে থেমে যায় সেখানে এসে দাঁড়ালাম। আর কিছু দূরে একটা ক্যফেটেরিয়া আছে। একটু দামী কিন্তু এই জায়গায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য উপযুক্ত। মনেস্ট্রি আরও কাছে এসে গেছে। এই তো আর একটু, কিন্তু আমাদের ওখানে যেতে অনেক রাস্তা এখনও চলা বাকি। এখানে বলে রাখি, এখানে কিন্তু কোনো রাস্তা নেই, যা আছে তা হল পায়ে চলে চলে তৈরি হওয়া কাচা পথ। বর্ষা কালে এখানে আপনি এক পাও এগোতে পারবেন না, পুরোটাই কাদা হয়ে যায়। চলতে চলতে অনেক পায়ের দাগ পাবেন, যেকোনো একটা ধরে চল্লেই আপনি একি জায়গায় পৌঁছে যেতে পারবেন। তবে যে পথ দিয়ে সব থেকে বেশী মানুষ যাচ্ছে সেটাই কম কষ্টকর, এটা ভেবেই এগিয়ে যাবেন।


মাটির রাস্তা, টাইগারনেস্ট

যেতে যেতে একটা বোর্ড দেখলাম, ৭ মিনিট বাকি। একটু খুসি হলাম, কিন্তু জানিনা, কে ৭ মিনিটে এ পথ গিয়েছিল। ৭ মিনিট পর মাটির পথ শেষ হল। এবার সিঁড়ি নামতে হবে। প্রায় ৩০০-৩৫০ সিঁড়ি দিয়ে নামতে হবে পাহাড়ের খাঁজে। তবে এ জায়গা থেকে অসাধারণ মনেস্ট্রির ভিউ পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলাম, তবে মনে একটা চিন্তাও আছে, ফেরার সময় এই সিঁড়ি উঠতেও হবে। একদম নিচে গিয়ে আমাদের স্বাগত জানাল একটা মন ভোরানো ঝর্না। দুটো পাহাড়ের খাজ দিয়ে বয়ে চলেছে। ছোট্ট একটা ব্রিজ পেরিয়ে আবার ২০০ সিঁড়ি উঠতে হবে মনেস্ট্রি তে পৌঁছাতে গেলে।


টাইগারনেস্ট, পারো

অবশেষে আমরা মনেস্ট্রির সামনে, এখানে সমস্ত কিছু (মোবাইল, ক্যমেরা, লাঠি, ব্যগ) লকারে রেখে দিয়ে চাবি নিতে হবে। এখান থেকেই ফ্রি তে গাইড পাবেন যে এই অসাধারণ মনেস্ট্রির ইতিহাস আপনার সামনে ফুটিয়ে তুলবে। তবে আমি সমস্ত ইতিহাস এখানে বলব না, এক কথায় বলি, গুরু পদ্মস্মভবা, যার ৮টি রূপ আছে, তিনি তিব্বত থেকে তাঁর এক ভক্ত (ফলোয়ার) (যে বাঘিনীর রূপ নেয়) এর কাধে চড়ে এখানে আসেন এবং এই মনেস্ট্রির মধ্যের গুহায় ৩ বছর ৩ মাস ৩ দিন ৩ ঘণ্টা ধ্যন (মেডিটেশান) করেন। আরও অনেক গল্প আছে যা আপনারা ওখানে এসেই শুনে নেবেন।

আমরা ৭.৩০শে যাত্রা শুরু করে এখানে ১১.৩০টায় এখানে পৌছাই। আমরা এখানে প্রায় ১.৩০ ঘণ্টা ছিলাম। আমরা ১টায় আবার ফিরতি পথে চলা শুরু করি। আর অনেক ক্লান্তি নিয়ে ৪টে তে গাড়ির কাছে এসে পৌছাই। ফিরে এসে দেখলাম একটা বেশ জমজমাট হাট বসেছে। অনেক ছোটো বড় গিফট আইটেম পাবেন এখানে আর আপনি দরাদরি করতেও পারেন। তবে বলে রাখি, যদিও এখানে আপনার জিনিসের দাম বেশী মনে হবে, তবুও ওটাই ভুটানের সর্বনিম্ন দাম। তাই কিছু কেনার থাকলে এখান থেকেই কিনে নিন। আমরা ৫টায় হোটেল এ প্রবেশ করে রাতের খাবার এর অর্ডার দিয়ে দিলাম, আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে ভাল করে বিশ্রাম নিতে হবে।




সকালে আজও ঘুম থেকে উঠে জানালার বাইরে একি ছবি চোখে পড়ল। সকালের সোনা রোদ দুরের পাহাড় টা ছুয়েছে মাত্র। নির্মেঘ আকাশ আর কনকনে ঠাণ্ডা। দুরের সেই গাছটায় আজও বরফ জমে। আজ আমরা যাব ১৩০০০ ফুট উচ্চতার ভুটানের সর্বচ্চ গাড়ি চলাচলের পাস চেলেলা পাসএ। পারো থেকে মাথা তুললেই দুরের চেলেলা পাসে টাওয়ার গুলো দেখা যায়। আর এই পাস পার করলেই দেখতে পাবেন অপরূপ হা ভ্যলি।

আর দেরি নয়, সকালের হালকা টিফিন সেরে আবার আমরা ঠিক ৯টায় গাড়িতে হাজির। গাড়ি আমাদের নিয়ে ছুটে চলল পারো শহরের দিকে। পুরো দেশটাই অসম্ভব ফোটোজেনিক, মানে আপনি যে দিকেই ফোটো তুলবেন সেটাই অসাধারণ লাগবে। শহরের দোকান পাট খুলেছে, তবে ভীর একেবারেই নেই। সুশৃঙ্খল ভাবে গাড়ি এগিয়ে যেতে যেতে ডান দিকে বাঁক নিয়ে উপরে উঠতে থাকল। এবার নীচের দিকে তাকিয়ে অসাধারণ পারো বিমান বন্দর এর ছবি ফুটে উঠল, আর আমাদের ভাগ্য খুব ভালই তাই ঠিক সেই সময় আকাশ থেকে ড্রুক এয়ার এর একটা বিমান মাটি ছুল। আপনাদের জন্য সে ভিডিও থাকল ।



সকালের অসাধারণ দৃশ্য দেখে আবার আমাদের চড়াই পথে যাত্রা শুরু হল চেলেলার উদ্দ্যশ্যে। পারো থেকে চেলেলার দূরত্ব ৩৭ কিমি, আরও ২৭ কিমি গেলেই হা। রাস্তার ধারে ধারে ছোট ছোট জলের ধারা যেগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম, যত উপরে যাচ্ছি সেগুলো সমস্ত জমে বরফ হয়ে গেছে। গাড়ির কাচ বন্ধ, তাও একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার স্রোত বয়ে যাচ্ছে শরীর জুড়ে। ২.৩০ ঘণ্টার গাড়ি যাত্রার পর আমাদের গাড়ি এসে দাঁড়াল এই পথের সর্বচ্চ পাস চেলেলা তে। গাড়ি থেকে নামার আগে ধরনা করতে পারছলাম না বাইরে কতটা ঠাণ্ডা। নামার পরে বুঝলাম, এখানে ঠাণ্ডার থেকে বেশি ভয়ঙ্কর এখানকার বাতাস। আর অসংখ্য প্রেয়ার ফ্ল্যগ সেই হাওয়াও পত পত করে উড়ে বেড়াচ্ছে। ডান দিকে পারো ভ্যলি, বাম দিকে হা আর সামনে ভুটানের সর্বচ্চ শৃঙ্গ জামালহারি। এক স্বর্গীয় দৃশ্য। সামনের উঁচু পাহাড়টায় হেটে এগিয়ে গেলাম। ঘাসের সবুজ গালিচায় হা ভ্যলির শোভা দেখতে দেখতে সময় অনায়াসেই বয়ে যাবে। চেলেলা একটা ধর্মীয় স্থানও বটে। এখানে অনেক দূর দূর থেকে স্থানীয় মানুষ পুজা দিতে আসেন। সেরকম একটা পুজা দেখার সুযোগ ও হয়ে গেল।

এখানে একটা ছোট্ট ঘটনা বলে রাখি, একটি পরিবার ব্রাম্ভন নিয়ে এখানে পুজা দিতে এসেছিলেন সেই সময়। আমরা তাঁদের পুজার ভিডিও করতে চাইলে তাঁরা সাদরে আমাদের অনুমতি দিলেন এবং খুব অনায়াসেই যেন তাঁরা আমাদের কে আপন করে নিলেন। তাঁরা পুজার পর এখানে খাওয়া দাওয়া করার জন্য খাবার এনেছিলেন, আমাদের কেও আমন্ত্রণ জানালেন। তবে আমরা খাবার না খেতে চাওয়ায় একটা ২ লিটার কোকাকলা বোতল আমাদের কে গিফট করলেন। আমারা কি এটা পারব??


চে লে লা পাস

চেলেলা থেকে হা তে যেতে পারেন। হা হল ভারত ও ভুটানের বর্ডার। তাই এখানে আপনি ভারতীয় এবং ভুটানি সৈন্য দের একসাথে দেখতে পাবেন। সেনা ক্যন্টিনে চা খেতে পারেন আর একটা বিচ্ছিন্ন ভুটানের নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। এটি সাধারনের জন্য খোলা ছিল না। কিছু বছর আগে এটি সাধারন পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। তবে অবশ্যই থিম্পু থেকে হা যে যাওয়ার জন্য পারমিট বানিয়ে নেবেন। যদি সময় আপনার বেশী না থাকে তাহলে হা তে না গিয়ে চেলেলা থেকে হা এর দিকে কিছু এগিয়ে পাবেন হা ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকে দু চোখ ভরে হা এর সৌন্দর্য উপভোগ করুন।

সময় ঘড়িতে ১.৩০, পেটে খিদে ডাক দিচ্ছে। ফিরতে হবে পারো তে। শুভ্র জামালহারি কে বাম দিকে রেখে আমরা পারোর উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। রাস্তার ধারে জলের ধারা গুলো এখনও জমে আছে। একদল বাংলাদেশের পর্যটক সেই জমাট বরফ গুলো হাতে নিয়ে উপভোগ করছে। আমরাও দাড়িয়ে পড়লাম। ব্যস, ভারত বাংলাদেশ একসাথে মিলে মিশে একাকার। শুরু হল গান চালিয়ে নাচ। ওঁদের সাথে দেখা হওয়াটাও স্মরণীয় হয়ে থাকল। ওনাদের ছবি দিলাম, হয়ত ফেসবুকে নিজেদের ফটো দেখে আবার যোগাযোগ হয়ে যাবে।


বাংলাদেশ যখন ভারতের সাথে মেলে

ফিরে এসে হোটেলে খাওয়া দাওয়া সারলাম। আজ আমাদের শেষ দিন ভুটানে। একটু পারো মার্কেট যাব ঠিক করলাম। গাড়ি আমাদের নিয়ে চলল পারো শহরের প্রান কেন্দ্রে। অনেক দোকান, ঝাঁ চকচকে বিদেশ। তবে জিনিসের দাম ও আকাশ ছোঁয়া। সূর্যি মামা ডুব দিয়েছে, ফিরে এলাম আবার হোটেল এ। আজকের মত শেষ। কাল কে আর বলার মত কিছু রাখলাম না। আমরা আবার সকাল ৯টায় ভুটানের অনেক স্মিতি নিয়ে ফুটসিলিং এর দিকে যাত্রা শুরু করলাম। দুপুর ১টায় আমাদের গাড়ি হাসিমারা স্টেশান এ দাঁড়াল। স্টেশানের পাশে একটা হোটেল থেকে উদর পুরন করে ট্রেনের অপেক্ষা করতে থাকলাম.... সমাপ্ত।




902 views0 comments

Recent Posts

See All

Comments


bottom of page