top of page

অচেনা সিমলিপাল ২য় পর্ব-

দেবকুন্ড ছেড়ে আমরা এলাম আবার উদলা নামক জায়গাটায়। এবার আমাদের গন্তব্য করনজিয়া। ম্যপ

বলছে ৯০ কিমি যেতে হবে আমাদের। ম্যপ অনুযায়ী আমরা চলতে থাকলাম। কিন্তু এই প্রথম ম্যপ


আমাদের ধোঁকা দিল। যে রাস্তা দেখাচ্ছে সে রাস্তা নাকি বাস্তবে নেই। তাই আমাদের আরও ১০-১২

কিমি ঘুরে যেতে হবে। অগত্যা আমাদের রাস্তা এবার জন সাধারন এর বলে দেওয়া রাস্তা তেই চলছে।

তবে সে রাস্তাও পেয়ে গেলাম ম্যপ এ। রাস্তা খুব খারাপ, সিঙ্গেল রোড। ৩৫ কিমি এসে পেলাম সরত

বলে একটি জায়গা। এর পর শুরু হল ঘন জঙ্গল। হায় হায় এ কোথায় এসে পৌঁছালাম। কোন মানুষ জন ও

নেই যে এটা জিজ্ঞাসা করার জন্য, আমারা ঠিক পথে যাচ্ছি কিনা। আমার আর ড্রাইভার এর মনের

মধ্যে কি যে চলছে সেটা বলে বোঝাতে পারব না। ৩৫জন মানুষের সব কিছু এখন আমাদের হাথে। তার

উপর রাস্তায় একটা লেখা পেলাম “সাবধান, হাতী চলাচলের রাস্থা”। আমরা কি জঙ্গলে প্রবেশ

করলাম? কাকে আর প্রশ্ন করব। রাস্তা ক্রমে ঢালু হচ্ছে। ঠিক ধরেছি। আমরা একটি পাহাড় এ

উঠছি। কোন গাড়ি, কোন মানুষ নেই কেন? এখানে এইভাবে আসা কি ঠিক হল। বিবেক থেকে বার বার

এই প্রশ্ন মনকে অশান্ত করে দিচ্ছে। ড্রাইভার আমার সঙ্গে আর কোন কথা বলছে না। বেচারি

নিজেই খুব চিন্তায়। আমরা ঘাটি পার হচ্ছি। এখানে বলে রাখি, কোন পাহাড় টপকে কে রাস্থা তৈরি হয়,

সেই উঁচু স্থানকে ঘাটি বলে। অনেকেই হয়ত বাংরিপশি ঘাটির নাম শুনেছেন। এটা সেরকম সুরত ঘাটি।

ঠিক ঘাটিতে এসে দেখলাম একদল মানুষ রাস্থা মেরামতের কাজ করছে। ঠাণ্ডা তেও ঘাম দিচ্ছিল।

একটু শান্ত হলাম ওদের দেখে। রাস্তা এতটাই খাড়া যে গাড়ির ১ম গিয়ার এও কষ্ট হচ্ছে আর বাঁক

গুলো এতটাই সরু যে গাড়িকে ব্যক করে এগোতে হচ্ছে। ঘাটি পেরিয়ে ভাল রাস্থায় এলাম। সূর্যি মামা

ঘাটিতেই অস্ত গেছেন। আঁধার নেমে এসেছে। রাস্থার কাজ হচ্ছে এখানে সেখানে। তাই রাস্তা খুব

খারাপ। রাত ৯ টায় আমরা এলাম করনজিয়া। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন আলোক বাবু।

আমাদের নিয়ে গেলেন আগে থেকে বুক করে রাখা একটি ধর্মশালা তে। সবাই সেখানে ঘর নিলাম আর

রাতের খাবার খেয়ে শুতে যেতে রাত ১১টা বেজে গেল।

পরের দিন খুব ভোর এ উঠতে হল। পূর্ব পরিকল্পনা মত আজ যাব সিমলিপাল এর গহন অরন্যে। আগে

থেকে বুক করা আছে ৪টি বোলেরো গাড়ি। ৯ জন করে সর্বমোট ৩৬জন যাব আমরা। ভোর ৫ টায় গাড়ি

ছেড়ে আমাদের নিয়ে যাবে সিমলিপাল অরন্যের দ্বারে। তবে আগে থেকে অলোক বাবু বলে দিয়েছিলেন

যে ওখানে সারা দিন খাবার কিছু পাওয়া যাবে না তাই শুখনো খাবার নিয়ে যেতে হবে। আমাদের রান্নীরা

ভোর ৪টে উঠে ৫টায় লুচি তরকারি প্যক করে নিলেন আর সঙ্গে টিফিন ও নিলেন। আমরা ভোর ৫ টা

৩০ মিনিট এ করনজিয়া থেকে যাত্রা শুরু করলাম যশিপুর এর দিকে। দূরত্ব ২৬ কিমি। ৪টি গাড়ি তেল

ভরে নিল পেট্রোল পাম্প থেকে। আর প্রতিটা গাড়ি থেকে একজন করে লিডার হতে হয়। আরও একটা

সতর্ক বার্তা এটি ম্যলেরিয়া প্রবন এলাকা তাই আন্টি ম্যলেরিয়া ড্রাগ আগে নেওয়া ভালো। তবে

এখানকার মানুষজনের থেকে জানলাম মশা থেকে ভয় নেই এখানকার জল থেকে সাবধানে থাকতে হবে।

সকাল ৭টায় আমরা এলাম যশিপুর টিকিট কাউন্টার এর সামনে। একটি ফর্ম ফিল আপ করতে হয়

সবার নাম, ঠিকানা, গাড়ি নাম্বার দিয়ে। প্রয়োজনে গাইড নিতে পারেন। তবে আমাদের লোকাল

ড্রাইভার তাই আর গাইড দরকার হবে না। গাড়ি পিছু একজন এর ভোটার কার্ড এর জেরক্স জমা

করতে হল। টিকিট ভারতীয়- জন প্রতি ১০০ টাকা , ১০ জনের উপরে গ্রুপ হলে ৫০টাকা জনপ্রতি

(আমরা এটাই নিলাম, ড্রাইভার সহ), সঙ্গে গাড়ি ভাড়া ১০০টাকা গাড়ি প্রতি। ক্যমেরা চার্চ আলাদা।

প্রত্যেক গাড়ি পিছু একটি করে কাগজের ব্যগ দিল যা নোংরা ফেলার জন্য। এটি একটি প্লস্টিক ফ্রি


এলাকা। সকাল ৮টায় আমরা এলাম এন্ট্রি গেটের সামনে। সমস্ত কাগজ চেক করে আমরা প্রবেশ

করলাম সিমলিপাল ব্যঘ্র প্রকল্পের মধ্যে (Simlipal Tiger Reserve)। চারিদিকে আকাশচুম্বী শাল

সেগুনের জঙ্গল। ধিরে ধিরে রোদের ঝাঁজ কমে এল। একটা স্যতস্যতে পরিবেশ। এখানে কখন সূর্যরের

আলো প্রবেশ করে না। গহন জঙ্গল একটা মায়াবী রোমাঞ্চকর আবহ রচনা করেছে। এত লোক না

থাকলে সত্যি গা টা ছম ছম করত।

প্রথম গাড়ি দাঁড়াল সেই আলো আধারি জঙ্গলের একটি পথের ধারে। পাশে হাথ বাড়িয়ে দেখিয়ে দিল

একটি বিরাট শাল গাছ কে। মহা বৃক্ষ শাল। বয়স ৩৪০ বছর। একটি ভয়ঙ্কর গল্প আছে। একবার এক

কাঠুরে এটি কাটতে আসেন আর দেখে সেই কাটা জায়গা থেকে রক্ত পড়ছে। এটিকে হেরিটেজ গাছ

হিসাবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আয়তনে বিরাট এই গাছের গুড়ি কে ৩-৪ জন মিলেও জড়িয়ে ধরা যায় না।

এরপর এলাম গুরগুরিয়া। এখানে হাতী দের চিকিৎসা করা হয়। সঙ্গে আছে ফরেস্ট বাংলো আর

অর্কিড গার্ডেন। পায়ে পায়ে জঙ্গল এর পথে একটু বেড়িয়ে নিলাম। দূরে ২ টি হাতী দাড়িয়ে আছে। তবে

এগুলো বন্য নয়। পায়ে শিকল আছে।

এর পর এলাম উস্কি জলপ্রপাত (উশ্রি নয়)। অনেক দূর থেকেই গর্জন টা কানে আসছিল। উচ্চতা

জানি না তবে মন ভরে গেল প্রথম জলপ্রপাত দেখে। ঘড়িতে তখন ৯টা ৩০মিনিট, আমরা এখানে টিফিন

সেরে নিলাম। এর পর আমরা আবার অজানা অচেনা প্রকিতির বুক চিরে এগিয়ে গেলাম পরবর্তী

গন্তব্যে। ক্রমশ...।

11 views0 comments

Recent Posts

See All

Comments


bottom of page