top of page

অচেনা সিমলিপাল ১ম পর্ব

১ম পর্ব-

আমার সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার জন্য অনেকেই অপেক্ষা করে। তবে সব সময় সম্ভব হয় না সবাইকে

নিয়ে কোথাও বেড়াতে যেতে । কখন বাজেট আবার কখন উপায় না থাকার কারনে আমার বেড়ানোর গ্রুপ

৮-১২ জন এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। না এবার বুঝি আর এড়ানো গেলো না। সবাই মিলে একসাথে চেপে

ধরল। পিকনিক কাম বেড়ানো। আর আমার সাথে সবাই যাবে কারণ বিখ্যত পিকনিক স্পট গুলি সব্বার

বেড়ানো হয়ে গেছে তাই নতুন জায়গার খোঁজ করতে হবে। প্রায় ৩০-৩৫ জনকে নিয়ে ঘুরতে যেতে হবে

তাও সবার আবদার নতুন জায়গায়, তো প্রস্তুতি তা একটু ভালো হওয়া চাই। আমার এক বউদির দূর

সম্পর্কের কাকু থাকেন উড়িষ্যার করনজিয়া নামে একটি জায়গায়। তিনি অনেকদিন থেকেই বউদিকে

যেতে বলছে আর বলছে তিনি সিমলিপাল ঘুরতে নিয়ে যাবেন। প্রথম নামটা কানে এল আর সুরু হল খোঁজ।

হাতের কাছে ভ্রমণসঙ্গী আর কম্পিউটার এ গুগুল আছে তো। একটা প্লান বানিয়ে নিলাম ফটাফট আর

এগিয়ে গেলাম বাস বুক করার জন্য। হ্যাঁ বাস, ঠিক শুনেছেন, ৩০-৩৫জন কে তো এমনি নিয়ে যাওয়া

যায় না।

না পারছি গাড়ির মালিক কে বঝাতে না পারছি ড্রাইভার কে বঝাতে যে আমরা ঠিক কথায় যেতে চাইছি।

শেষএ গুগুল ম্যপ দেখে কিলোমিটার হিসাব করে দিলাম আর গাড়ির মালিক গাড়ি দিতে রাজি হলেন। তবে

একটাই শর্ত আমাকে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

জানুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহ গেল। ঠাণ্ডা টা জাঁকিয়ে পড়েছে। আমাদের নতুন এডভেঞ্চার এর দিন

এসে গেল। আমরা ৫ জানুয়ারী সন্ধ্যা ৫টায় বাস ছেড়ে এগিয়ে চললাম আজানা গন্তব্যে। সঙ্গী আমার

ফোন আর গুগুল ম্যপ। কোলকাতা পার হতে ৮টা বেজে গেল। রাতের জন্য খাবার প্রস্তুত ছিল। আমরা

সর্বমোট ৩৬জন ( ড্রাইভার, হেল্পার ও ২জন রান্নী সহ)। রাতের খাবার খেয়ে নিলাম কোলাঘাট এ

একটি ধাবায় দাড়িয়ে। লুচি আর ফুলকপির তরকারি প্যক করা। সবার মধ্যে আমার উপর ভরসা আর

আমার ভরসা ভগবান আর গুগুল। আমার যথারীতি বাস এর কেবিন এ জায়গা হয়েছে। বাস এর মালিক

ড্রাইভার কে বলে দিয়েছে এই ছেলেটাকে ছাড়বে না।

রাত ১২টা নাগাদ গাড়ি ওড়িশা বর্ডার এ এসে থামল। ড্রাইভার আমাকে নিয়ে চলল ট্যক্স দিতে। গাড়ির

বাইরে নেমে ঠাণ্ডায় হাত পা জমে গেল। বাসের সব্বাই ঘুমোচ্ছে। কেউ কেউ ছোটো কাজ সেরে নিচ্ছে।

আমি আর ড্রাইভার ট্যক্স জমা করে চা খেলাম গরম গরম। তার পর আবার যাত্রা শুরু। NH6 ধরে

এগিয়ে চলেছি। ঝকঝকে রাস্থা ধরে চলতে চলতে ভোর ৩টে আমরা এলাম বালাসোর। ম্যপ বলছে এখান

থেকে ডান দিকে যেতে হবে। প্রসঙ্গত এখান থেকে বাঁ দিকে ২০ কিমি গেলেই চাদিপুর। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা,

কোন মানুষের দেখা নেই রাস্থায়, শুধু জেগে আছি আমি, ড্রাইভার, হেল্পার আর আমার গুগুল ম্যপ।

রাস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। হটাত দেখি রাস্থায় বাঁশ দিয়ে ব্যরিকেট। পাশের ঝুপড়ি থেকে চাদর মোরা

একটি লোক এসে ১০ টাকা রোড ট্যক্স নিয়ে গেল। ম্যপ বলছে ৪৫ কিমি গেলে পাব উদলা বলে একটি

জায়গা। ভগবান এর নাম করে চলতে থাকা। ঠিক ঠাক দূরত্বে পেলাম উদলা। ঘড়িতে সময় ভোর ৫টা।


চারিদিক অন্ধকার, কিছু মানুষ প্রাতঃ ভ্রমণ এ ব্যস্ত। উদলা থেকে ৬.৪ কিমি ডানদিকে গেলে পাব

দেবকুন্ড রোড। আমরা ভোর ৫টা ৩০মিনিট এ সেই রোড এর সামনে এসে গেলাম। আরও দু একটা গাড়ি

দাড়িয়ে।

আমাদের আজকের গন্তব্য দেবকুন্ড। কিছুক্ষণ দাড়িয়ে আমরা আবার চলতে শুরু করলাম ২০ কিমি

দুরের দেবকুন্ড এর দিকে। লাল মাটির দেশ, দূরে উকি দিচ্ছে সিম্লিপাল জঙ্গল এর রেঞ্জ আর উঁচু

নিচু পাহাড়। এ এক অন্য জগতে এসে পড়লাম। সূর্য খিলখিলিয়ে হেসে উঠল সেই জঙ্গলের মাথায় আর

হাস মুরগী নিয়ে ব্যস্ত আদিবাসী বাচ্চাদের দল, মাঝে মাঝে গাড়ির সামনে এসে পড়ছে। খুব সাবধানে

এগিয়ে চললাম। সারা রাত এর না ঘুমানোর ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল এই অন্য জগতে এসে।

৬টা ৩০মিনিটে আমাদের গাড়ি এল দেবকুন্ড এর প্রবেশ দ্বার এর সামনে। জঙ্গলের মধ্যে রান্না চলে

না তাই এখানেই আমরা রান্নী আর রান্নার সামগ্রী নামিয়ে দিলাম। মাথা পিছু ১০ টাকা করে এন্ট্রি

ফ্রি। বাস যেতে পারবে কুন্ডের ১ কিমি আগে পর্যন্ত, বাকিটা পায়ে হেঁটে। রাস্তা বলতে লাল মাটীর

পথ। সেই পথ ধরেই আমাদের বাস এগিয়ে চলল। ৮টায় আমরা গাড়ি রেখে পায়ে হাঁটা পথ ধরলাম। মন

ভরে গেল। ঘন জঙ্গল, মাটীর পথ আর পথ এগিয়ে চলেছে দেও নদীর কুলু কুলু ধারা ধরে। কারো মনেই

হল না ১ কিমি পথ কত অনায়াসে গল্প করতে করতে পেরিয়ে এলাম আর যে গর্জন টা অনেক আগে

থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম তার সামনে এসে দারালাম।১০০ মিটার উঁচু থেকে লাফিয়ে পড়ছে দেবকুন্ড

জলপ্রপাত। ঝর্নার জলরাশি প্রায় ২০০ বর্গ মিটার জায়গা জুড়ে নয়নাভিরাম জল কুন্ডের সৃষ্টি

করেছে। স্বচ্ছ শীতল টল টলে জল আর সামনের তিন দিক ঘেরা পাহারের দেওয়াল এক অপরুপ শোভা

সৃষ্টি করেছে। কুন্ডের পাশে দিয়ে পাথরের সিড়ি উঠে গেছে জল্প্রপাত এর ঠিক মাথায় অবস্থিত দেবী

অম্বিকার মন্দিরএ। চারিদিকে বন্য আবহাওয়া যেন এক মায়াবী মায়াজাল রচনা করেছে। ভাগ্যিস

আমরা ৩০জন নাহলে এখানকার গা ছম ছম করা পরিবেশ বুকের ভিতরে শিহরণ জাগিয়ে তুলবে। এটি

শুধুমাত্র ঝর্না, কুন্ড আর মন্দির নয়। এটি একটি শক্তিপীঠ। ৫১ শক্তিপীঠ এর একটি হল এই

দেবকুন্ড এর মা অম্বিকা। মায়ের দর্শন আর পুজা শেষ করলাম এই মন্দির এ এসে। মন্দির এর পিছনে

আর ও এক মনমুগ্ধকর দৃশ্য আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ঠিক মন্দিরের পিছন দিয়ে দেও নদী

ঝাপিয়ে পড়ছে কুন্ডের জলে। জঙ্গল আর পাহাড় ঘেরা সরু উপত্যকা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সেই নদীর ধারা।

আর কি চাই। সব্বাই খুশীতে ২-৩ ঘণ্টা এখানে সময় কাটিয়ে দিল আর আমাকে ধন্যবাদ দিতে লাগল।

কেউ কেউ সেই শীতল কুন্ডের জল এ স্নানটাও সেরে নিল। এর পর আবার গুটি গুটি পায়ে ফিরে এলাম

আমাদের বাস এর কাছে। বাস আমাদের নিয়ে এল যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল আমাদের

রান্নীদের বানানো গরম ভাত, ডাল, আলুভাজা, মুরগির মাংস, চাটনি আর পাঁপড় ভাজা। খেয়ে নিয়ে দুপুর

২টার সময় আমাদের বাস আবার রহনা হল পরবর্তি গন্তব্যের দিকে।

ক্রমশঃ......।।

14 views0 comments

Recent Posts

See All

Comentários


bottom of page