top of page

অচেনা সিমলিপাল পর্ব- ৩

উস্কি ফলস দেখে আমরা এগিয়ে গেলাম জঙ্গলের আরও গভীরে। কখনও ঘন জঙ্গল আবার কখন

উন্মুক্ত প্রান্তর পেরিয়ে এগিয়ে চলেছি। এ যেন চাঁদের পাহাড়ের স্যুটিং সেট এ এসে প্রবেশ করেছি।

আমাদের গাড়ি এসে দাঁড়াল আমাদের পরের গন্তব্যে। বোর্ড এ লেখা বেহরাপানি জল্প্রপাত। ফলস

উচ্চতা- ৪০০ মিটার। তখন ও ভাবতে পারিনি ওড়িশার সিম্লিপাল রেঞ্জ এ এরকম কোন স্থান থাকতে

পারে। শিলং এর কোন জলপ্রপাত এর সাথে গুলিয়ে যেতে পারে এ দৃশ্য। অসাধারণ ভিউ পয়েন্ট এর জন

মানব শুন্য গহন জঙ্গলের অন্দরে। যেন সামনের পাহাড় থেকে কেউ দুধ ঢেলে দিয়েছে নিচের গভীর

খাতে। উষ্ণ রোদ্দুর গায়ে মেখে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকা সেই দুধ এর ধারার দিকে।

ঘড়িতে তখন ১২টা বাজে। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার তারা দিল। পরবর্তী গন্তব্যে যেতে হবে। অগত্যা

আবার গাড়িতে এসে শুরু হল আমাদের জঙ্গল যাত্রা। মাঝে মাঝে ছোট্ট আদিবাসী গ্রাম। বাচ্চা বাচ্চা

ছেলে মেয়েরা ঘুরে বেড়াচ্ছে রাস্তায়। এতো গভীর জঙ্গলে এরা কি করছে? কোন জগাজগ নেই, আমাদের

আধুনিক সমাজ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন এক জাতি। মাঝে মাঝে যারা ফরেস্ট কর্মী দের গাড়ি ছাড়া

আর কিছুই দেখতে পায় না। আমাদের দেখে তারা খুব উচ্ছসিত। সবাই হাথ বাড়িয়ে আছে গাড়ির দিকে।

ভাবলাম টাকা পয়সা কিছু চাইছে। কিন্তু তাদের চাহিদার কথা ড্রাইভার এর কাছে শুনে আরও অবাক

হয়ে গেলাম আর তাদের চাহিদা পুরনের সামগ্রী আমাদের কাছে নেই এটা ভেবে খুব দুঃখ হল। জানেন


তারা কি চায়? চকলেট। টাকা পয়সা কি হবে? যারা বেরাতে আসে তারা ভালবেসে চকলেট দেয়। তাই হাথ

বাড়িয়ে চকলেট এর আশায় ওই ছোট্ট বাচ্চা গুলো। সত্যি জানা ছিল না এটা। মন টা কেমন যেন

ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। কিন্তু কে জানত এর পরের গন্তব্যে আরও চমক আছে।

চারিকিকে শাল মহুয়ার ঘন জঙ্গল, একটি ফরেস্ট অফিস, একজন মহিলা ফরেস্ট অফিসার, এই

প্রেক্ষাপটে গাড়ি থামল। বলল সামনে আছে জোরান্ডা জল প্রপাত। এর উচ্চতা ৫০০ মিটার। গাড়ি

থেকে নামতেই একটা গর্জন কানে এল। গর্জন লক্ষ করে আমরা এগিয়ে গেলাম সামনে পাহাড়ের

খাতের দিকে। অসাধারণ, অবর্ণনীয় সে দৃশ। আমি ভুলেই গেলাম এটা ওরিশা নাকি উত্তর ভারতের

হিমালয়ের কোন খাত। ৫০০ মিটার উপর থেকে জল ধারা ঝাপিয়ে পড়ছে নিচের খাতে। নিচে আর জল নেই

সবই জল কনা ধোয়ার আকার নিয়েছে। আমরা আছি ফলস এর উপরে। সবুজ গিরি খাত বুক এ ভ্য

ধরালেও অসাধারন। সবাই মন্ত্র মুগ্ধের মত সেই রূপ আস্বাদন করছে। সবার চোখে মুখে সেই খুসি

আমার এই বেরাতে আনার পুরষ্কার। দুপুর ২টা বেজে গেল। এবার দুপুরের খাওয়া টা খেয়ে নিতে

হবে।ওখানেই সবাই মিলে শুখনো লুচি, ফুলকপি কারি, মিষ্টি সহযোগে দুপুরের খাওয়া সেরে আবার

যাত্রা শুরু করলাম।

বিকাল ৪টে বাজে, মাথার রোদ্দুর ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। জঙ্গল ক্রমে ভয়ংকর হয়ে উঠবে। হঠাত গাড়ি

দাড়িয়ে গেল। রাস্তার উপর এক ঝাঁক বন্য হরিণ এর দল। তারা আমাদের রাস্তা ছেড়ে দিল। আমরা

এসে পউছালাম চাওলা। ময়ূরভঞ্জ রাজা দের শিকার খেত্র। রাজাদের ডাক বাংলো এখন আছে। সঙ্গে

তৈরি হয়েছে ফরেস্ট বিভাগ এর বাংলো। এখানে রাত্রিবাস করা যায় স্পেসাল পারমিট নিয়ে। সামনে

বন্য জন্তুদের বিচরণ খেত্র। একটা গা ছম ছম পরিবেশ। একটা বাজে পচা গন্ধ নাকে আসছে। ফরেস্ট

বিভাগ এর কর্মী কে জিজ্ঞাসা করলাম কিসের গন্ধ। যা বলল শুনে বুক টা ধরাস করে উঠল। আগের

রাত এর আমাদের থেকে ১০০ গজ এর মধ্যে একটা হরিণ কে বাঘ ঘায়েল করেছে। অর্ধেক নাকি খেয়ে

গেছে। ওটাকে মানুষ ছুয়ে দিলে বাঘ আর খাবে না তাই ওই ভাবে রাখা আছে। বাঘ আবার আসবে ওটা

খেতে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। দূরে এক ঝাঁক হরিণ লবণ খেতে এসেছে। এবার নিশ্চই বাঘ মামা আসবে।

আর সাহসে এল না ওখানে থাকতে। ঘড়িতে ৫টা বাজে। আমরা গাড়ি করে আবার যাত্রা শুরু করলাম

ফিরতি পথে করনজিয়ার উদ্দশ্যে। ক্রমশঃ......

12 views0 comments

Recent Posts

See All

Comments


bottom of page